Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশ, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত হল

Advertisement

Icon

মুহাম্মদ রুহুল আমীন

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশ, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত হল

Advertisement

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস- আইসিজে) অন্তর্বর্তী আদেশ রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এটা জোর দিয়ে বলা যায়। বংশপরম্পরায় বঞ্চনার শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে যারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ক্ষতি পূরণের পাশাপাশি আগামী দিনে নতুন করে যাতে আর কোনো রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এটা নিশ্চিত করা জরুরি।

নির্যাতনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজ দেশ ছেড়ে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কয়েক বছর আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস- আইসিজে) অন্তর্বর্তী রায়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা রোধে মিয়ানমারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছেন। বস্তুত এ রায়ের মধ্য দিয়ে গাম্বিয়া, ওআইসি, রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের জন্য একটি বিজয়ের সূচনা হল। আশা করা যায়, আইসিজের অন্তর্বর্তী রায় নতুন করে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বংশপরম্পরা বহুমাত্রিক বঞ্চনার শিকার হওয়ায় তাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আর সেসব পদক্ষেপ যাতে যথাযথ সময়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিলেও নিরাপত্তার অভাবে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে রাজি হচ্ছে না। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও তাদের অনুগতরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছে। নির্যাতনের সেসব কাহিনী বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করেছে।

আইসিজের আদেশের প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বলেছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। তবে গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি। অর্থাৎ অং সান সু চি রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছেন। আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার আলামত নষ্ট না করার বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

আইসিজের আদেশের পর অং সান সু চি যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে, মিয়ানমার রাখাইনে গণহত্যার আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। কাজেই মিয়ানমার যাতে এবিষয়ক আর কোনো অপরাধ সংঘটনে সফল হতে না পারে, এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমার কী পদক্ষেপ নিয়েছে আগামী চার মাসের মধ্যে এবিষয়ক প্রতিবেদন আদালতের (আইসিজে) সামনে উপস্থাপন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া এ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস পরপর আদালতকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য জানাতে হবে। উল্লেখ্য, রাখাইনে এখনও ছয় লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। আইসিজের আদেশে তাদের সুরক্ষা প্রদানের কথাও বলা হয়েছে।

আমরা লক্ষ করেছি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নামে এর মধ্যে মিয়ানমার নানা রকম প্রহসনের আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার আইসিজের রায় অমান্য করার পাঁয়তারা করতে পারে। এক্ষেত্রেও দেশটি নতুন কোনো কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। মিয়ানমারের কোনো নিরাপত্তা বাহিনী যাতে রোহিঙ্গাদের উসকানি না দেয় এবং নির্যাতনের চেষ্টা না করে- এসব বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বস্তুত আইসিজের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্তই মিয়ানমার নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

কোনো অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে দেশটি যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে না পারে সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। উল্লেখ্য, বংশপরম্পরায় বঞ্চনার শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় জর্জরিত। তাদের সুরক্ষায় আইসিজে যে চূড়ান্ত রায় প্রদান করবেন তা বাস্তবায়নে কোনো রকম জটিলতা সৃষ্টি হবে কিনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম এজন্য যে অর্থনৈতিক কারণেও এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক নতুন নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়। সে সম্পর্ক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মেরুকরণে প্রভাব বিস্তার করবে কিনা, এটাও ভাবার বিষয়।

ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নানা উদ্যোগ নিলেও চীনসহ আরও কিছু দেশের কারণেই সেসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের নানা রকম জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেসব তথ্য বিবেচনায় নিলেই প্রশ্ন জাগে, আইসিজের চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো রকম জটিলতা সৃষ্টি হবে কিনা?

চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে মিয়ানমারে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশকে সংযুক্ত করার প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত থেকে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে লাভবান হতে চাইছে চীনও। এছাড়া সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের মিয়নামার সফরের সময় দু’দেশের মধ্যে ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে দু’দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক অতীতের চেয়ে আরও দৃঢ় হবে।

অর্থাৎ চীন-মিয়নামার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা এখন আরও স্পষ্ট হলো। অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে ভারত ও মিয়ানমারের সখ্যের বিষয়টি বহুল আলোচিত। এছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সখ্যের বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসে। আগামী দিনে উল্লিখিত দেশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নিতে পারে- এসবও বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

আইসিজের অন্তর্বর্তী ও চূড়ান্ত আদেশ বাস্তবায়নে যাতে মিয়ানমার কোনো রকম গড়িমসি না করে, এর জন্য বাংলাদেশকেও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য বাংলাদেশের কূটনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশকে মিয়ানমার চীন, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গেও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিকল্পও বিবেচনায় রাখতে হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সমর্থন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলো যাতে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থের চেয়ে এক্ষেত্রে নৈতিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনগত বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়, সে লক্ষ্যে জোর প্রয়াস চালাতে হবে আমাদের। লক্ষ করার বিষয় হল, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত কারণে চীন ও ভারত মিয়ানমারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করে। এদেশ দুটি মিয়ানমার থেকে যেসব বাণিজ্যিক সুবিধা গ্রহণ করছে, সেসব সুবিধা পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে যাতে বাংলাদেশে পায়, এজন্যও সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা যায়। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় কোনো একটি দেশ অন্য কোনো দেশে বাণিজ্যিক সুবিধা পেলে সে সুবিধা সহজে ছাড়তে চায় না।

গাম্বিয়া, ওআইসি এবং বাংলাদেশকেও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে যাতে চীন, রাশিয়া ভারতসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশ বাণিজ্যিক সুবিধার পরিবর্তে দেশগুলোর নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত না থাকলে দেশটি কৌশলে আইসিজের রায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করতে পারে। এসব প্রচেষ্টার পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর পদক্ষেপও নিতে হবে।

মুহাম্মদ রুহুল আমীন : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

রোহিঙ্গা

Advertisement

আরও পড়ুন

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম