করোনা সংকট ও আইনজীবীদের সমস্যা
jugantor
করোনা সংকট ও আইনজীবীদের সমস্যা

  পারভেজ তৌফিক জাহেদী  

০২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংকটকালীন দেশব্যাপী লকডাউনে দুই মাসের অধিক সময় আমাদের রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশের সব আইনজীবী সমিতি বন্ধ থাকায় রাজশাহী বারসহ সব বার সমিতি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে সীমিত আকারে কাজকর্ম শুরু হলেও আমাদের দৈনন্দিন আয় স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। এ তিন মাসেই কোটি টাকার উপর আয় হারিয়েছে রাজশাহী বার। রাজশাহী অ্যাডভোকেট বারের মতো দেশের সব বার সমিতি নিজেরা আয় করে এবং সেই টাকা কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ, পানিসহ যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করে।

এছাড়া সব আইনজীবীর জন্য কল্যাণ তহবিল, উৎসব, চিকিৎসা ও অন্যান্য ফান্ডের টাকাও নিজেরা আয় করে এবং নিজেরাই সেখান থেকে খরচ করে। আমরা সরকারি কোনো অনুদান পাই না। কোনো রকম প্রণোদনাও কেউ দেয় না। যদিও এ খাত থেকে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আমরা সরকারকে আয় করে দিই। এমতাবস্থায় কর্মচারীদের বেতনসহ স্বাভাবিক মেইনটেন্যান্স খরচ বহন করতে সমিতিগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

একইভাবে দেশের সব আইনজীবী ব্যক্তিগতভাবেও ভীষণ আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। আইনজীবীরা বেতন পান না। ভার্চুয়াল কোর্টের কারণে ১০ শতাংশ ফৌজদারি প্র্যাকটিশনাররা কিছুটা সুবিধা পেলেও দেওয়ানি ও অন্যান্য আইনজীবী শোচনীয় অবস্থায় পড়েছেন। ভার্চুয়াল আদালতে খুবই সীমিত আকারে মামলা চলছে।

সারেন্ডার, ফাইলিংসহ অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল অ্যাডভোকেটসহ আদালত সংশ্লিষ্ট সবার করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। ই-কোর্ট চালুর পূর্ব শর্তগুলো পূরণ না করে ভার্চুয়াল আদালত শুরু করায় কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। লাখ লাখ বিচারপ্রার্থী নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

থানায় অহরহ মামলা এন্ট্রি হচ্ছে, পুলিশ আসামি ধরার জন্য অভিযান চালাচ্ছে; কিন্তু আইনি প্রতিকার তথা আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষকে অনৈতিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। একইভাবে অনেক জমিজমা শক্তিশালী স্থানীয়রা জোরপূর্বক দখল করে নিচ্ছে; কিন্তু তার দেওয়ানি প্রতিকার দেয়া যাচ্ছে না। এ রকম অসংখ্য অবর্ণনীয় জটিলতার মধ্যে আমরা আছি।

সরকার ৩১ মে লকডাউন তুলে নিয়েছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব অফিস, ব্যাংক, শপিংমল, কলকারখানা চলছে। শুধু আদালতে ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের চিকিৎসক, পুলিশ, প্রশাসনসহ সব স্তরের কর্মকর্তারা মাঠে থেকেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। করোনাভাইরাস সংকট খুব দ্রুত সমাধানেরও সম্ভাবনা নেই।

এভাবে বসে থাকলে আমরা উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হব। দেশ ক্রমান্বয়ে হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগোচ্ছে। আপাতত ফৌজদারি মামলার হাজিরা, সাক্ষ্য গ্রহণ ও দেওয়ানি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবি রেখে সব কাজে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা সম্ভব। আমাদের বিদ্যমান আদালতের নিয়ম অনুযায়ী বিচারক তার ২-৩ জন কর্মচারী সঙ্গে নিয়েই বিচারকার্য করেন। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা বেশ দূর থেকেই শুনানি করেন। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে কেউই সংক্রমিত হবে না।

আমি আবারও বলছি, আমরা আইনজীবীরা সরকারকে এ খাত থেকে সম্ভবত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করে থাকি। এ টাকা দিয়েই সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়। আইনজীবীরা কোনো বেতন বা প্রণোদনা পান না।

এ অবস্থায় উপরিউক্ত বিষয়গুলো সুবিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব আইনজীবী, আইনজীবী সমিতি, বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখার স্বার্থে অন্তত অধস্তন আদালতগুলো যথাযথভাবে অবিলম্বে খুলে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

এ সমস্যাগুলো থেকে দ্রুত পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে একই সঙ্গে আইনজীবীদের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতিসহ দেশের সব আইনজীবী সমিতির প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

অ্যাডভোকেট পারভেজ তৌফিক জাহেদী : সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশন

ptzahedy@gmail.com

করোনা সংকট ও আইনজীবীদের সমস্যা

 পারভেজ তৌফিক জাহেদী 
০২ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংকটকালীন দেশব্যাপী লকডাউনে দুই মাসের অধিক সময় আমাদের রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশের সব আইনজীবী সমিতি বন্ধ থাকায় রাজশাহী বারসহ সব বার সমিতি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে সীমিত আকারে কাজকর্ম শুরু হলেও আমাদের দৈনন্দিন আয় স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। এ তিন মাসেই কোটি টাকার উপর আয় হারিয়েছে রাজশাহী বার। রাজশাহী অ্যাডভোকেট বারের মতো দেশের সব বার সমিতি নিজেরা আয় করে এবং সেই টাকা কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ, পানিসহ যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করে।

এছাড়া সব আইনজীবীর জন্য কল্যাণ তহবিল, উৎসব, চিকিৎসা ও অন্যান্য ফান্ডের টাকাও নিজেরা আয় করে এবং নিজেরাই সেখান থেকে খরচ করে। আমরা সরকারি কোনো অনুদান পাই না। কোনো রকম প্রণোদনাও কেউ দেয় না। যদিও এ খাত থেকে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আমরা সরকারকে আয় করে দিই। এমতাবস্থায় কর্মচারীদের বেতনসহ স্বাভাবিক মেইনটেন্যান্স খরচ বহন করতে সমিতিগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

একইভাবে দেশের সব আইনজীবী ব্যক্তিগতভাবেও ভীষণ আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। আইনজীবীরা বেতন পান না। ভার্চুয়াল কোর্টের কারণে ১০ শতাংশ ফৌজদারি প্র্যাকটিশনাররা কিছুটা সুবিধা পেলেও দেওয়ানি ও অন্যান্য আইনজীবী শোচনীয় অবস্থায় পড়েছেন। ভার্চুয়াল আদালতে খুবই সীমিত আকারে মামলা চলছে।

সারেন্ডার, ফাইলিংসহ অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল অ্যাডভোকেটসহ আদালত সংশ্লিষ্ট সবার করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। ই-কোর্ট চালুর পূর্ব শর্তগুলো পূরণ না করে ভার্চুয়াল আদালত শুরু করায় কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। লাখ লাখ বিচারপ্রার্থী নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

থানায় অহরহ মামলা এন্ট্রি হচ্ছে, পুলিশ আসামি ধরার জন্য অভিযান চালাচ্ছে; কিন্তু আইনি প্রতিকার তথা আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষকে অনৈতিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। একইভাবে অনেক জমিজমা শক্তিশালী স্থানীয়রা জোরপূর্বক দখল করে নিচ্ছে; কিন্তু তার দেওয়ানি প্রতিকার দেয়া যাচ্ছে না। এ রকম অসংখ্য অবর্ণনীয় জটিলতার মধ্যে আমরা আছি।

সরকার ৩১ মে লকডাউন তুলে নিয়েছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব অফিস, ব্যাংক, শপিংমল, কলকারখানা চলছে। শুধু আদালতে ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের চিকিৎসক, পুলিশ, প্রশাসনসহ সব স্তরের কর্মকর্তারা মাঠে থেকেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। করোনাভাইরাস সংকট খুব দ্রুত সমাধানেরও সম্ভাবনা নেই।

এভাবে বসে থাকলে আমরা উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হব। দেশ ক্রমান্বয়ে হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগোচ্ছে। আপাতত ফৌজদারি মামলার হাজিরা, সাক্ষ্য গ্রহণ ও দেওয়ানি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবি রেখে সব কাজে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা সম্ভব। আমাদের বিদ্যমান আদালতের নিয়ম অনুযায়ী বিচারক তার ২-৩ জন কর্মচারী সঙ্গে নিয়েই বিচারকার্য করেন। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা বেশ দূর থেকেই শুনানি করেন। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে কেউই সংক্রমিত হবে না।

আমি আবারও বলছি, আমরা আইনজীবীরা সরকারকে এ খাত থেকে সম্ভবত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করে থাকি। এ টাকা দিয়েই সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়। আইনজীবীরা কোনো বেতন বা প্রণোদনা পান না।

এ অবস্থায় উপরিউক্ত বিষয়গুলো সুবিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব আইনজীবী, আইনজীবী সমিতি, বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখার স্বার্থে অন্তত অধস্তন আদালতগুলো যথাযথভাবে অবিলম্বে খুলে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

এ সমস্যাগুলো থেকে দ্রুত পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে একই সঙ্গে আইনজীবীদের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতিসহ দেশের সব আইনজীবী সমিতির প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

অ্যাডভোকেট পারভেজ তৌফিক জাহেদী : সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশন

ptzahedy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

২৬ নভেম্বর, ২০২১