বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্জ্য ও পরিবেশ
jugantor
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্জ্য ও পরিবেশ

  মো. তাজুল ইসলাম  

০৪ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকা স্বাভাবিক এবং সারা বিশ্বই এ বাস্তবতা মোকাবিলা করছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা দ্বারা ওইসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মানুষ উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে না।

যেমন: অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং বহু চাহিদা সৃষ্টি হবে, বর্ধিত চাহিদা পূরণের জন্য যানবাহন ও যাতায়াত বাড়বে, বাড়বে ভোগ, তাই রাস্তায় যানজট বাড়বে; তখন রাস্তা প্রশস্ত বা অধিক রাস্তা করতে হবে।

অধিক ভোগের কারণে অধিক বর্জ্য উৎপাদন হবে। এ বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে গোটা পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটাবে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

স্বাধীনতা লাভের পর সদ্যস্বাধীন দেশটি ছিল সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে সব সমস্যা মোকাবিলা করে সোনার বাংলা বা উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশকে দিশেহারা করে ফেলা হয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খাদ্য ঘাটতি চরম আকার ধারণ করে। বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার ১০ শতাংশ নিচে নেমে যায়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ১৯৯৫ সালে মাত্র ৩১৯ ডলার। স্বাভাবিকভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নাজুক হওয়ায় ভোগের পরিমাণ ছিল নিতান্তই কম। যে কারণে বর্জ্য উৎপাদন হতো নগণ্য।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২১০০ ডলারের উপর। শতভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রচুর কলকারখানা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

মানুষের আয় বাড়ার কারণে গ্রাম ও শহরে মানুষ বেশি ক্রয় ও ভোগ করছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রতি স্তরে অধিক পরিমাণে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর পরিমাণ শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই প্রতিদিন ৬/৭ হাজার টন।

সারা দেশে এর পরিমাণ সব স্তর মিলে লক্ষাধিক টনের মতো। এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিষ্পত্তির কোনো বৈজ্ঞানিক এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলছে। তাই খালবিল, নদীনালাগুলো ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে পচনশীল বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে এবং অপচনশীল বর্জ্য ভৌগোলিক ও জলবায়ুর কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করছে। শহরগুলোয় মানুষের ঘনত্ব বেশি বলে শহরের বর্জ্য বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে।

দেশের সব সিটি করপোরেশন এবং কিছু পৌরসভা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে ল্যান্ডফিল্ডে ফেলছে। এখন আর ল্যান্ডফিল্ড ইয়ার্ডেও জায়গা নেই এবং ল্যান্ডফিল্ড ইয়ার্ড থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হচ্ছে, তাই ল্যান্ডফিলিং কোনো সুষ্ঠু সমাধান নয়।

২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে প্রথম থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিই।

এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর সফর করে তাদের বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আমাদের দেশের বড় শহরগুলোর জন্য ইনসিনারেশন পদ্ধতিই প্রযোজ্য। অন্য শহরগুলোর জন্য Omni processor বা আপাতত Segregation পদ্ধতি অনুসরণযোগ্য।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা করে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করে ইনসিনারেশন পদ্ধতি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ একটি কমিটি করে তাদের করণীয় ঠিক করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের সার্বিক কারিগরি পর্যালোচনার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়।

বাকি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সর্বদা তদারকি করছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেও একই প্রক্রিয়ায় একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সিটি করপোরেশনে একই পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান আছে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন দিক থেকে নানা প্রশ্নের উদ্রেগ হচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য অনেকের অনুরোধে এ লেখা।

বাসাবাড়ি, দোকানপাট, হাসপাতাল ও শিল্প-কারখানা থেকে কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব উৎপত্তিস্থলে পচনশীল ও অপচনশীন উভয় বর্জ্য থাকে। পচনশীল বর্জ্যগুলোকে আলাদা করে কম্পোস্ট সার তৈরি করা যায়, যার ক্যালোরিক ভ্যালু অনেক কম।

সেক্ষেত্রে ইনঅর্গানিক বা অপচনশীল বর্জ্যে ক্যালোরিক ভ্যালু অনেক বেশি থাকায় প্রচুর জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে পচনশীল ও অপচনশীন বর্জ্য আলাদা করবেন? হয় প্রতি বাড়িতে অথবা সেকেন্ডারি ডাম্পিং স্টেশনে করতে হবে। উন্নত দেশ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বহু দেশ বাসাবাড়ি স্তরে বর্জ্য আলাদা করার চেষ্টা করলেও অনেকে সফল হয়নি।

কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি বাসাবাড়ি, মাছ-মাংস ও শাকসবজির দোকান ইত্যাদি স্থান থেকে আলাদা আলাদাভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করা বাস্তবতার সঙ্গে কতটুকু সংগতিপূর্ণ আর কতজন মানুষ তা সঠিকভাবে করবে?

দ্বিতীয়ত, secondary বা final stage-এ আলাদা করতে গেলে বিস্তৃত এলাকায় দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু ছড়াবে। আবার যেসব লোক আলাদা করার কাজ করবে, তারা বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। তারা নিজেরা রোগাক্রান্ত হওয়ার পর তার পরিবারকে আক্রান্ত করবে এবং পরবর্তী সময়ে আশপাশের লোকজনও সমাজকে আক্রান্ত করবে।

তৃতীয়ত, জৈব বর্জ্য দিয়ে যে সার তৈরি হবে, এর মধ্যে অনেক বিপজ্জনক উপাদান যেমন: মারকারি, কেডিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল, লেড ও আর্সেনিক থাকতে পারে, যা অ্যাগ্রিকালচারাল প্রডাক্টের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করবে, যে কারণে অটিস্টিক সন্তান জন্ম নেবে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে জন্মগত ত্রুটি ও বয়স্কদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হবে।

মিশ্রিত গৃহস্থালি বর্জ্য পৃথিবীর যে দেশেই উৎপন্ন হোক-থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া বা চীন-সবকটির গুণাবলি কাছাকাছি। কারণ বর্জ্যের মধ্যে থাকে হাড়, কাঁটা, ভাত, রুটি, আলু, মাছ, মাংস বা সবজির অংশবিশেষ; যা খাওয়া থেকে এবং বিভিন্ন দোকান ও কাঁচাবাজার থেকে আসে। পৃথিবীর সব দেশে মানুষের ভোগের পরিমাণে তারতম্য থাকলেও তারা এগুলো ভোগ করে।

প্যাকিং মেটারিয়াল, পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট, কাগজ বা সুতাজাতীয় পদার্থ সব দেশেই পরিমাণের তারতম্যভেদে বিদ্যমান থাকে। অতএব মিশ্রিত গৃহস্থালি বর্জ্যরে ক্যালোরিক ভ্যালু সব দেশেরই শহরগুলোয় প্রায় সমান। কিন্তু আমরা যে পদ্ধতি অনুসরণ করছি, তাতে দায়িত্বটা বিনিয়োগকারীর; কারণ তিনি বুঝে নেবেন বর্জ্যে থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি তিনি পাবেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য।

আমরা তাদের ৩৩ একর জমি দেব কারখানা স্থাপনের জন্য এবং প্রতিদিন ৩০০০ টন মিশ্রিত বর্জ্য দেব, তাতে ক্যালোরিক ভ্যালু কমবেশি থাকবে, সে দায়িত্ব বিনিয়োগকারীর। ক্যালোরিক ভ্যালু বেশি হলে তিনি বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন করতে পারবেন আর কম থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হবে।

এক্ষেত্রে লাভ-লোকসান তার, আমাদের নয়। এ কারণে তারা নিজেরা সবকিছু বিবেচনা করেই বিনিয়োগ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি নেই; কিন্তু তাদের ৩০০০ টন বর্জ্য পোড়াতে হবে-এ বাধ্যবাধকতা রাখা আছে।

পরিবেশের সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে, যেন উদ্গীরিত ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন, ক্যাডিয়াম, ক্রোমিয়াম, সালফার, লেড ও নিকেল কোনোভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্ট্যান্ডার্সের বেশি হতে না পারে।

অন্যদিকে উল্লিখিত পদার্থ যদি বেশি নির্গত হয়, তাহলে বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হবে। পানি শতভাগ বিশুদ্ধ করে তা যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতৎসত্ত্বেও পাঁচ শতাংশের মতো অবশিষ্ট কঠিন পদার্থ পাওয়া যাবে, যা দিয়ে টাইলসহ অন্য অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব।

সুতরাং যে বর্জ্য প্লান্টে ঢুকবে, তা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে। কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ বর্জ্য ভিন্ন বিষয়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা এবং দূরে জায়গা চিহ্নিত করা হচ্ছে, যাতে ওইসব বর্জ্য প্রসেস করে পূর্ণ ব্যবস্থা করা যায়।

জাইকার প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ব্যাপারে আমরা অবহিত। এ বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান প্রকৌশলীসহ জাপানের Toyo ইউনিভার্সিটি, টোকিওতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি। জাপানে যে ধরনের Incineration Plant চালানো হয়, আমরাও একই ধরনের প্রকল্প করছি। এতৎসত্ত্বেও এ বিষয়ে গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে স্বাগত জানাই।

মো. তাজুল ইসলাম : মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্জ্য ও পরিবেশ

 মো. তাজুল ইসলাম 
০৪ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকা স্বাভাবিক এবং সারা বিশ্বই এ বাস্তবতা মোকাবিলা করছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা দ্বারা ওইসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মানুষ উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে না।

যেমন: অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং বহু চাহিদা সৃষ্টি হবে, বর্ধিত চাহিদা পূরণের জন্য যানবাহন ও যাতায়াত বাড়বে, বাড়বে ভোগ, তাই রাস্তায় যানজট বাড়বে; তখন রাস্তা প্রশস্ত বা অধিক রাস্তা করতে হবে।

অধিক ভোগের কারণে অধিক বর্জ্য উৎপাদন হবে। এ বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে গোটা পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটাবে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

স্বাধীনতা লাভের পর সদ্যস্বাধীন দেশটি ছিল সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে সব সমস্যা মোকাবিলা করে সোনার বাংলা বা উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশকে দিশেহারা করে ফেলা হয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খাদ্য ঘাটতি চরম আকার ধারণ করে। বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার ১০ শতাংশ নিচে নেমে যায়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ১৯৯৫ সালে মাত্র ৩১৯ ডলার। স্বাভাবিকভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নাজুক হওয়ায় ভোগের পরিমাণ ছিল নিতান্তই কম। যে কারণে বর্জ্য উৎপাদন হতো নগণ্য।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২১০০ ডলারের উপর। শতভাগ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রচুর কলকারখানা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

মানুষের আয় বাড়ার কারণে গ্রাম ও শহরে মানুষ বেশি ক্রয় ও ভোগ করছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রতি স্তরে অধিক পরিমাণে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর পরিমাণ শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই প্রতিদিন ৬/৭ হাজার টন।

সারা দেশে এর পরিমাণ সব স্তর মিলে লক্ষাধিক টনের মতো। এত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিষ্পত্তির কোনো বৈজ্ঞানিক এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলছে। তাই খালবিল, নদীনালাগুলো ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে পচনশীল বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে এবং অপচনশীল বর্জ্য ভৌগোলিক ও জলবায়ুর কঠিন সমস্যার সৃষ্টি করছে। শহরগুলোয় মানুষের ঘনত্ব বেশি বলে শহরের বর্জ্য বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে।

দেশের সব সিটি করপোরেশন এবং কিছু পৌরসভা বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে ল্যান্ডফিল্ডে ফেলছে। এখন আর ল্যান্ডফিল্ড ইয়ার্ডেও জায়গা নেই এবং ল্যান্ডফিল্ড ইয়ার্ড থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হচ্ছে, তাই ল্যান্ডফিলিং কোনো সুষ্ঠু সমাধান নয়।

২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে প্রথম থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিই।

এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর সফর করে তাদের বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আমাদের দেশের বড় শহরগুলোর জন্য ইনসিনারেশন পদ্ধতিই প্রযোজ্য। অন্য শহরগুলোর জন্য Omni processor বা আপাতত Segregation পদ্ধতি অনুসরণযোগ্য।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা করে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করে ইনসিনারেশন পদ্ধতি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ একটি কমিটি করে তাদের করণীয় ঠিক করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের সার্বিক কারিগরি পর্যালোচনার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়।

বাকি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সর্বদা তদারকি করছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেও একই প্রক্রিয়ায় একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সিটি করপোরেশনে একই পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান আছে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন দিক থেকে নানা প্রশ্নের উদ্রেগ হচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য অনেকের অনুরোধে এ লেখা।

বাসাবাড়ি, দোকানপাট, হাসপাতাল ও শিল্প-কারখানা থেকে কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব উৎপত্তিস্থলে পচনশীল ও অপচনশীন উভয় বর্জ্য থাকে। পচনশীল বর্জ্যগুলোকে আলাদা করে কম্পোস্ট সার তৈরি করা যায়, যার ক্যালোরিক ভ্যালু অনেক কম।

সেক্ষেত্রে ইনঅর্গানিক বা অপচনশীল বর্জ্যে ক্যালোরিক ভ্যালু অনেক বেশি থাকায় প্রচুর জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে পচনশীল ও অপচনশীন বর্জ্য আলাদা করবেন? হয় প্রতি বাড়িতে অথবা সেকেন্ডারি ডাম্পিং স্টেশনে করতে হবে। উন্নত দেশ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বহু দেশ বাসাবাড়ি স্তরে বর্জ্য আলাদা করার চেষ্টা করলেও অনেকে সফল হয়নি।

কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি বাসাবাড়ি, মাছ-মাংস ও শাকসবজির দোকান ইত্যাদি স্থান থেকে আলাদা আলাদাভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করা বাস্তবতার সঙ্গে কতটুকু সংগতিপূর্ণ আর কতজন মানুষ তা সঠিকভাবে করবে?

দ্বিতীয়ত, secondary বা final stage-এ আলাদা করতে গেলে বিস্তৃত এলাকায় দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু ছড়াবে। আবার যেসব লোক আলাদা করার কাজ করবে, তারা বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। তারা নিজেরা রোগাক্রান্ত হওয়ার পর তার পরিবারকে আক্রান্ত করবে এবং পরবর্তী সময়ে আশপাশের লোকজনও সমাজকে আক্রান্ত করবে।

তৃতীয়ত, জৈব বর্জ্য দিয়ে যে সার তৈরি হবে, এর মধ্যে অনেক বিপজ্জনক উপাদান যেমন: মারকারি, কেডিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল, লেড ও আর্সেনিক থাকতে পারে, যা অ্যাগ্রিকালচারাল প্রডাক্টের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করবে, যে কারণে অটিস্টিক সন্তান জন্ম নেবে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে জন্মগত ত্রুটি ও বয়স্কদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হবে।

মিশ্রিত গৃহস্থালি বর্জ্য পৃথিবীর যে দেশেই উৎপন্ন হোক-থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া বা চীন-সবকটির গুণাবলি কাছাকাছি। কারণ বর্জ্যের মধ্যে থাকে হাড়, কাঁটা, ভাত, রুটি, আলু, মাছ, মাংস বা সবজির অংশবিশেষ; যা খাওয়া থেকে এবং বিভিন্ন দোকান ও কাঁচাবাজার থেকে আসে। পৃথিবীর সব দেশে মানুষের ভোগের পরিমাণে তারতম্য থাকলেও তারা এগুলো ভোগ করে।

প্যাকিং মেটারিয়াল, পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট, কাগজ বা সুতাজাতীয় পদার্থ সব দেশেই পরিমাণের তারতম্যভেদে বিদ্যমান থাকে। অতএব মিশ্রিত গৃহস্থালি বর্জ্যরে ক্যালোরিক ভ্যালু সব দেশেরই শহরগুলোয় প্রায় সমান। কিন্তু আমরা যে পদ্ধতি অনুসরণ করছি, তাতে দায়িত্বটা বিনিয়োগকারীর; কারণ তিনি বুঝে নেবেন বর্জ্যে থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি তিনি পাবেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য।

আমরা তাদের ৩৩ একর জমি দেব কারখানা স্থাপনের জন্য এবং প্রতিদিন ৩০০০ টন মিশ্রিত বর্জ্য দেব, তাতে ক্যালোরিক ভ্যালু কমবেশি থাকবে, সে দায়িত্ব বিনিয়োগকারীর। ক্যালোরিক ভ্যালু বেশি হলে তিনি বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন করতে পারবেন আর কম থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হবে।

এক্ষেত্রে লাভ-লোকসান তার, আমাদের নয়। এ কারণে তারা নিজেরা সবকিছু বিবেচনা করেই বিনিয়োগ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি নেই; কিন্তু তাদের ৩০০০ টন বর্জ্য পোড়াতে হবে-এ বাধ্যবাধকতা রাখা আছে।

পরিবেশের সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে, যেন উদ্গীরিত ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন, ক্যাডিয়াম, ক্রোমিয়াম, সালফার, লেড ও নিকেল কোনোভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্ট্যান্ডার্সের বেশি হতে না পারে।

অন্যদিকে উল্লিখিত পদার্থ যদি বেশি নির্গত হয়, তাহলে বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হবে। পানি শতভাগ বিশুদ্ধ করে তা যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতৎসত্ত্বেও পাঁচ শতাংশের মতো অবশিষ্ট কঠিন পদার্থ পাওয়া যাবে, যা দিয়ে টাইলসহ অন্য অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব।

সুতরাং যে বর্জ্য প্লান্টে ঢুকবে, তা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে। কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ বর্জ্য ভিন্ন বিষয়। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা এবং দূরে জায়গা চিহ্নিত করা হচ্ছে, যাতে ওইসব বর্জ্য প্রসেস করে পূর্ণ ব্যবস্থা করা যায়।

জাইকার প্রাক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ব্যাপারে আমরা অবহিত। এ বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান প্রকৌশলীসহ জাপানের Toyo ইউনিভার্সিটি, টোকিওতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি। জাপানে যে ধরনের Incineration Plant চালানো হয়, আমরাও একই ধরনের প্রকল্প করছি। এতৎসত্ত্বেও এ বিষয়ে গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের মতামতকে স্বাগত জানাই।

মো. তাজুল ইসলাম : মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন