স্বদেশ ভাবনা
এ অর্জনে সব সরকারের অবদান রয়েছে
Advertisement
আবদুল লতিফ মন্ডল
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) ২৬ ফেব্রুয়ারি তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়নে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের সুপারিশ করেছে।
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা-এ তিন সূচকে বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করায় সিডিপি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নয়ন দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিলের সুপারিশ করেছে।
উল্লেখ্য, সিডিপির নিয়মানুযায়ী, এলডিসি থেকে বের হতে হলে পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে উপর্যুক্ত তিনটি সূচকের অন্তত দুটিতে সফলতা অর্জন কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়।
২০১৮ সালে এলডিসির তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য তিনটি সূচকে বাংলাদেশ প্রথম সাফল্য অর্জন করে। ২০১৮ থেকে ২০২১-এ তিন বছরেও বাংলাদেশ এসব সূচকে অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এদিকে ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যে জানা যায়, জাতিসংঘের পর্যালোচনায় ২০১৯ সালে মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড নির্ধারিত ছিল ১ হাজার ২২২ মার্কিন ডলার।
ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ মার্কিন ডলার, আর বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ড ৬৬-র বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৫ দশমিক ৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে উত্তরণের জন্য মানদণ্ড নির্ধারিত ছিল ৩২ বা তার কম। আর ওই সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭।
তবে এলডিসি থেকে বের হয়ে পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলতে বাংলাদেশকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৬ সালে চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলবে। ওই বছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এলডিসি থেকে ডেভেলপিং কান্ট্রিতে উত্তরণে জাতিসংঘের সিডিপির সুপারিশপ্রাপ্তি দেশবাসীর জন্য নিঃসন্দেহে খুশির খবর। তবে এ অর্জনের কৃতিত্ব কোনো একটি সরকারের নয়, দেশের এ যাবৎকালের সব সরকারের এতে অবদান রয়েছে।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে সার্বিক কৃষি খাত (সার্বিক কৃষি বলতে শস্য, বন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে বোঝানো হয়েছে), শিল্প খাত, নির্মাণ খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, পরিবহণ, পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সার্বিক সার্ভিস খাত, রেমিট্যান্স ইত্যাদি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পরপর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
এ সরকারের সময় প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) সূত্রে জানা যায়, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আর এ পরিকল্পনার প্রথম দুবছর (১৯৭৩-৭৫) কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারের প্রথম তিন বছর এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) কৃষিতে গড় প্রবৃদ্ধি হয় ৫ দশমিক ২ শতাংশ হারে।
সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে জিয়াউর রহমানের পাঁচ বছরের শাসনামলে কৃষকদের ব্যাপক হারে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার উপযোগী নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়।
এতে কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়ে। জিয়াউর রহমান সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘মিশ্র অর্থনৈতিক’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করে।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদানের ফলে শিল্প খাতে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হলো বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় জনশক্তি রপ্তানি। এটির শুরু হয়েছিল জিয়ার আমলে।
ওই সরকারের শেষ অর্থবছরে (১৯৮০-৮১) জাতীয় বাজেটের পরিমাণ পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ অর্থবছরের (১৯৭৪-৭৫) এক হাজার ৮৪ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে চার হাজার ১০৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ১৯৭২ সালে ১০০ মার্কিন ডলারের নিচে থাকা মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৫ মার্কিন ডলারে।
জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে নয় বছর (২৪ মার্চ ১৯৮২ থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০) দেশ শাসন করেন। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৮০-৮৫) জিয়াউর রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রণীত হলেও এটি বাস্তবায়িত হয় এরশাদের আমলে। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিপরীতে অর্জিত হয় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তার শাসনামলে প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয় তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৮৫-৯০)। থানাকে উপজেলায় এবং মহকুমাকে জেলায় উন্নীতকরণসহ স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন ছাড়াও এরশাদের শাসনকাল অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য পরিচিতি লাভ করে। যাতায়াত ব্যবস্থা, বিশেষ করে সড়ক নির্মাণ ও মহাসড়ক উন্নয়নে বিশেষ অগ্রগতি সাধিত হয়।
নির্মিত হয় শত শত কিলোমিটার পাকা রাস্তা। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো খুলনা-মোংলা পাকা সড়ক নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উন্নয়ন। শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ছিল লক্ষণীয়। এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের শেষ বছরের (১৯৯০-৯১) বাজেটে ব্যয় ধরা হয় ১২ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, যা বিএনপির ১৯৮০-৮১ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের তিন গুণের বেশি।
১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা সত্ত্বেও বহুমুখী উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে এরশাদ সরকারের শেষ বছরে মাথাপিছু আয় ৩০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দক্ষ মানবসম্পদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানবসম্পদ উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম।
এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলক) আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৯০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তির অনুপাত ছিল ৫৫:৪৫। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে এরশাদ সরকার বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। দেশে প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন ওয়েলফেয়ার সেন্টার বা ‘এফডব্লিউসি’ নির্মাণ ও চালুকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
এরপর ১৯৯১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ঘটে।
এ সরকারের আমলে নারীশিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৯৪ সাল থেকে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান শুরু হয়। এ কর্মসূচি মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীভর্তি হার বৃদ্ধি এবং ঝরেপড়া রোধে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এ সরকারের আমলে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে রয়েছে-১৯৯৬ সালের নভেম্বরে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি, ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি এবং যমুনা সেতুর (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু) নির্মাণ কাজ সম্পন্নকরণ। এ সরকারের আমলে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে। এ সরকারের আমলে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এ সরকার জোর দেয়। দেশের প্রথম উড়াল সেতু ঢাকা মহানগরীর মহাখালীতে নির্মিত হয় এ সরকারের আমলে। এর আগের শাসনামলে খালেদা জিয়ার সরকার নারীশিক্ষার ওপর যে জোর দেয়, তা এ মেয়াদে আরও গুরুত্ব পায়। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারীশিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। তাদের বই কেনা ও পরীক্ষার ফি পরিশোধে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের সময় বাদ দিলে ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১২ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। টানা একযুগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে এ সময়কালে ঈর্ষণীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮২৭ মার্কিন ডলারে।
বিপুল পরিমাণে বেড়েছে দেশের জিডিপির আকার। মানবসম্পদ উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রভূত সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৫ থেকে ২৪ জনে নেমে এসেছে।
দেশের জনগণের গড় আয়ু ২০০৬ সালের ৬৫ থেকে ৭২ দশমিক ৮ বছরে উন্নীত হয়েছে (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০)। সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০-১৯)।
সবশেষে বলতে চাই, উন্নয়নশীল দেশের সারিতে বাংলাদেশের শরিক হওয়া এখন মাত্র সময়ের ব্যাপার। চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্তির জন্য যে পাঁচ বছর সময় আমরা প্রস্তুতির জন্য পেয়েছি, তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। সেইসঙ্গে এটিও স্বীকার করতে হবে যে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্তিতে এ যাবৎকালের দেশের সব সরকারের কমবেশি অবদান রয়েছে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
