করোনাভাইরাসের নতুন ধরন এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার কার্যকারিতা
Advertisement
রাশিদুল হক
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েই যাচ্ছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এ নিয়ে বিশ্বে করোনায় প্রাণহানি সাড়ে ২৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার বর্তমানে একটি ভিন্ন মাত্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর ভিন্ন ধরন (variant) বা জাতের প্রাদুর্ভাবের ফলে বিশ্বব্যাপী এক ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় আগে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া সারস-কোভ-২ করোনাভাইরাস সময়ের ব্যবধানে মিউটেশনের মাধ্যমে অসংখ্যবার রূপ বদলিয়েছে, যার মধ্যে সারস-কোভ-২ ভাইরাসের যে তিনটি রূপ বা ধরন বেশি আলোচিত এবং আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেগুলো হচ্ছে : যুক্তরাজ্যের বি.1.1.7 (B.1.1.7), দক্ষিণ আফ্রিকার বি 1.351 (B.1.351) এবং ব্রাজিলের পি .1 (P.1) ভ্যারিয়েন্ট।
আমরা জানি, যেসব জীবের জিনোম বা বংশাণুসমগ্র হলো জীবের জিনগত বৈশিষ্ট্যের বিন্যাস বা নকশা। ব্যাকটেরিয়া ও সব জীবের জিনোম হচ্ছে ডিএনএ (DNA), তবে ভাইরাসের জিনোম দু-ধরনের হতে পারে : ডিএনএ বা আরএনএ (RNA)। করোনাভাইরাস পরিবারের যে সদস্য ভাইরাসগুলো বিদ্যমান তারা হলো আরএনএ গ্রুপের ভাইরাস। সারস-কোভ-২ ভাইরাসের ‘আরএনএ জিনোম’ অনেক জটিল এবং অন্যান্য করোনাভাইরাসের তুলনায় অনেক বড়। এ জিনোম প্রায় ৩০ হাজার ক্ষারকবিশিষ্ট নিউক্লিওটাইড (এডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থায়ামিন) নিয়ে গঠিত যা ভাইরাসের ২৫ থেকে ৩০টি প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের পেছনে যে দুটি প্রোটিন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংক্রমণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তা হলো ভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’ এবং মানবকোষের আবরণীপৃষ্ঠে (cell membrane) অবস্থিত ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-রূপান্তরিত এনজাইম ২ (এসিই ২’) বা ACE-2 রিসেপ্টর প্রোটিন। অর্থাৎ, স্পাইক প্রোটিন পরিপূরক বাহক কোষের এসিই-২ প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পরই ভাইরাসগুলো মানবকোষের ভেতর প্রবেশ করে এবং কোষের অভ্যন্তরে তারা হাজার-হাজার প্রতিলিপি তৈরি করে, যা আমাদের ফুসফুসসহ দেহের অন্য অঙ্গগুলো অকার্যকর করে দেয়। এ বন্ধন বাধ্যবাধকতাপূর্ণ বলেই আমাদের দেহে যেসব অঙ্গে বা কোষগুলোয় ACE2 প্রোটিন বিদ্যমান নয়, সেসব কোষগুলোর ভেতর করোনাভাইরাস প্রবেশ করার কোনো সুযোগ থাকে না। শিশুদের কোষগুলোয় পর্যাপ্ত ACE2 প্রোটিন না-থাকার কারণে তারা নিরাপদ। বিশেষ করে, ভাইরাসের প্রবেশপথ নাসারন্ধ্রের কোষগুলোয় ACE2 প্রোটিন অনুপস্থিত থাকার কারণে শিশুদের দেহে করোনাভাইরাস প্রবেশ করতে সক্ষম হয় না। তবে শিশুরা কত বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
সংক্রমণশীল স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটুকু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন (RBD: আরবিডি), অর্থাৎ পুরো স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তে কেবল RBD এসিই রিসেপ্টর প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পুরো ভাইরাসকে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন ২০০টি অ্যামিনো অ্যাসিড নিয়ে গঠিত। মিউটেশনের মাধ্যমে কোনো অ্যামিনো অ্যাসিড ইতঃপূর্বে পরিলক্ষিত অবস্থান থেকে যদি পরিবর্তিত হয়, তাহলে দুটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যা স্পাইক প্রোটিনের সংক্রমণশীলতা কমাতে বা বাড়াতেও পারে। দুর্ভাগ্যবশত এ রকম একটি রূপান্তর (N501Y) অর্থাৎ করোনাভাইরাস বি.১.১.৭ জাতের (UK variant) স্পাইক প্রোটিনের রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইন-এ অ্যামিনো অ্যাসিড ‘এস্পারাজিন (Asparagine)’ ভিন্ন একটি অ্যামিনো অ্যাসিড ‘টাইরোসিন (tyrosine)’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার ফলে তার সংক্রমণ ক্ষমতা প্রায় ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে এ রূপটি ব্রিটেনে প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয় (CDC, USA)। এ ছাড়া আরও একটি রূপান্তরের (E484K) ফলে প্রোটিনের গ্লুটামিক অ্যাসিড-এর পরিবর্তে লাইসিন প্রতিস্থাপিত হয়। বর্তমানে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ভাইরাসের এ ধরনটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংক্রমণের হারও অনেক বেড়ে গেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার B.1.351 ভ্যারিয়েন্ট-এর স্পাইক-আরবিডি এলাকায় ঘটিত ৩টি মিউটেশনের মধ্যে একটি রূপান্তর (N501Y) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে UK বি.1.1.7 জাতের মিউটেশনের মতো এস্পারাজিন-এর পরিবর্তে টাইরোসিন প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ব্রাজিলের পি.১ ভ্যারিয়েন্ট আবির্ভাবের ফলে স্বয়ং ব্রাজিলের কয়েকটি শহর এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ওই দেশটিতে এখন প্রায় দু-হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। দৈনিক মৃত্যু সংক্রমণে এখনো শীর্ষে লাতিন এ দেশটি, যেখানে দেশটির মোট প্রাণহানি দুই লাখ ৯৬ হাজারের মতো। এ ভাইরাসের জিনোমে ১৭টি অনন্য মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে যার মধ্যে স্পাইক প্রোটিনের RBD অংশে বিদ্যমান N.501Y-সহ ৩টি রূপান্তর এ জাতটিকে অধিকতর সংক্রমণশীল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশেও পি.১ ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, উল্লিখিত তিনটি প্রধান ভেরিয়েন্টের দুটি মিউটেশন N501Y এবং E484K উভয় ক্ষেত্রে উপস্থিত যা উহান করোনাভাইরাসের থেকে নতুন ভ্যারিয়ানগুলো অধিকতর সংক্রমণশীল এবং E484K মিউটেশন এমনকি মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকেও আক্রমণ করার ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার কার্যকারিতা
অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ক’দিন আগে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে চালানো সাম্প্রতিক একটি পরীক্ষামূলক জরিপে দেখা গেছে টিকাটি নিরাপদ ও কার্যকর। সম্মিলিতভাবে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা ওষুধ কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র, চিলি এবং পেরু দেশগুলোর ৩২ হাজারেরও বেশি ভলান্টিয়ারদের নিয়ে এ পরীক্ষা চালিয়েছে। এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর এক-পঞ্চমাংশ ছিল ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। এ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রায় ৭৯ শতাংশ সফল এবং টিকা দেওয়ার পর কারও দেহে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো তথ্য মেলেনি (www.nih.gov/news-events/, মার্চ ২২)। কাজেই, এ টিকা নেওয়ার ফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেশগুলোয় রক্ত জমাট বাঁধার যে খবর পাওয়া গিয়েছিল তার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া টিকাটি নিরাপদ বলেও জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি (EMA) ১৩টি ইউরোপীয় দেশ রক্ত জমাট বাঁধার সংক্রমণের আশঙ্কায় এ ভ্যাকসিন ব্যবহার স্থগিত করার পর এ ভ্যাকসিনটি আবার পর্যালোচনা করার পর জানিয়েছে যে, এই টিকা রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে মোটেই সম্পর্কিত নয়। অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে যে, ৮ মার্চ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষকে টিকা প্রদানের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার রিপোর্ট পাওয়া গেছে মাত্র ৩৭টি। সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আবারও টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু করেছে (https://www.bbc.com/news/world-europe-56440139)। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার বা মডার্নার টিকাগুলো করোনাভাইরাস ভ্যারিয়েন্টগুলোর বিপরীতে দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে অনেকটাই সক্ষম। এ নিয়ে আরও গবেষণা চলছে।
এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী যেসব কোম্পানি কোভিড-১৯ টিকা প্রয়োগ করে যাচ্ছে সেগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার/বায়ো-ঘটেক-৭২টি দেশ, মডার্না-৩২টি দেশ, এবং Janssen/জনসন-জনসন-২টি দেশ, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা-৭১টি দেশ, চায়নার সাইনোফার্ম-১৯টি দেশ ও সাইনোভাক-১১টি দেশ, রাশিয়ার স্পুটনিক ১৮টি দেশ, ভারতের নিজস্ব কোভাক্সিন (ভারত বায়োটেক)-১টি দেশ। পূর্ণাঙ্গ এক ডোজের জনসন টিকা ছাড়া, বাকি সব কটিই ২-ডোজের টিকা, এবং এ টিকাগুলো ৬৩ শতাংশ (জনসন-জনসন) থেকে ৯৫ শতাংশ (ফাইজার, মডার্না) পর্যন্ত কোভিড-১৯-কে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ‘কোভিশিল্ড’ নামে উৎপাদন করছে। বাংলাদেশে এখন করোনার যে টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি কোভিশিল্ড যার একটি অর্ধ-ডোজের এক মাস পর একটি সম্পূর্ণ ডোজ প্রয়োগ করা হলে টিকাকরণটি ৯০ শতাংশ প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখায় (AstraZeneca Press release, 2020)।
বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা নিতে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। টিকা নিতে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আরও বেশি করে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে, সংক্রমণ থেকেও তত বেশি সুরক্ষা পাওয়া যাবে।
প্রফেসর রাশিদুল হক : প্রো-ভিসি, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী
