Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

স্বদেশ ভাবনা

উদার গণতান্ত্রিক সূচকে মানোন্নয়নের বিকল্প নেই

Advertisement

Icon

আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উদার গণতান্ত্রিক সূচকে মানোন্নয়নের বিকল্প নেই

Advertisement

২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি (ভি-ডেম) সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন-২০২১ প্রকাশ করেছে। ‘অটোক্রাটাইজেনশন টার্নস ভাইরাল’ তথা ‘স্বৈরাচারীকরণ ভাইরাল হচ্ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত ১১ মার্চ প্রকাশিত হয়।

সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে ভি-ডেম প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সংখ্যায় পঞ্চম। প্রতিবেদনটির মুখবন্ধে বলা হয়েছে, ‘It summarizes the state of liberal democracy in the world in 2020

against the backdrop of developments over the last 10 years.’ এর অর্থ দাঁড়ায়, গত ১০ বছরের উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে বিশ্বে উদার গণতন্ত্রের অবস্থার সংক্ষিপ্তসার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের রিপোর্টে যেখানে ফোকাস ছিল ‘প্রতিবাদের বছর’, সেখানে ২০২০ সালের রিপোর্টের ফোকাস হলো ‘লকডাউনের বছর’। ভি-ডেমের এ বার্ষিক প্রতিবেদনে উদার গণতান্ত্রিক সূচকে শীর্ষ তিন স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে। সূচকের তলানিতে রয়েছে যথাক্রমে ইরিত্রিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইয়েমেন।

প্রতিবেদন ২০২১-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্যে রয়েছে- ক. ১৭৯টি দেশের মধ্যে ৫৫টির স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বড় আকারে বা মাঝারিভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। খ. এক-তৃতীয়াংশ দেশে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ব্যতিরেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গ. গত এক দশকে বিশ্বে উদার গণতন্ত্রের মাত্রাতিরিক্ত অবক্ষয় এবং ২০২০ সালে তা বিশেষভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকায় অব্যাহত থাকে।

ঘ. বিশ্বে ৮৭টি দেশে ‘ইলেকটোরাল অটোক্র্যাসি’ তথা ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র’ বিরাজ করে এবং এসব দেশে বিশ্বের ৬৮ শতাংশ মানুষের বাস। ঙ. গত এক দশকে বিশ্বে উদার গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা ৪১ থেকে ৩২-এ নেমে এসেছে। ছ. স্বৈরতন্ত্রের ‘তৃতীয় ঢেউয়ের’ গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চ. বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের প্রতি হুমকি বৃদ্ধি পেয়েছে। ছ. সুশীল সমাজের ওপর দমন-পীড়ন বেড়েছে।

এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদার গণতান্ত্রিক সূচকে (লিবারেল ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্স) ১৭৯টি দেশের মধ্যে শূন্য দশমিক ১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪তম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র সূচকে (ইলেকটোরাল ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্স) বাংলাদেশের অবনমন হয়েছে। এ সূচকে শূন্য দশমিক ২৭ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮তম। স্কোর হ্রাস পেয়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ০৩১। তাছাড়া লিবারেল কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, ইগলিট্যারিয়ান কম্পোনেন্ট ইনডেক্স, পার্টিসিপেটরি কম্পোনেন্ট ইনডেক্স এবং ডেলিবারেটিভ কম্পোনেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১৬১, ১৭৬, ১৪৩ ও ১৫৮। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে বাংলাদেশ আছে ‘নির্বাচনভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র’ (ইলেকটোরাল অটোক্র্যাসি) বিভাগে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তথ্যাদি থেকে দেখা যায়, অন্যান্য জনবহুল ও প্রভাবশালী দেশ যেমন-হংকং, বাংলাদেশ, হাঙ্গেরি, ফিলিপাইন, তানজানিয়া একনায়কতান্ত্রিক দলে অন্তর্ভুক্ত।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি ঘটছে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) কর্তৃক প্রকাশিত ১০ পয়েন্টভিত্তিক ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্সগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ৬ দশমিক ১১ স্কোর করে।

ইআইইউ’র ২০১৮ সালের গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৫৭ স্কোর নিয়ে ৮৮তম স্থানে দাঁড়ায়। আর ২০১৯ সালের গণতন্ত্র সূচকে ৫ দশমিক ৯৯ স্কোর নিয়ে বৈশ্বিক গণতন্ত্র তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৬তম। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা হ্রাস পাচ্ছে এবং একযুগের বেশি সময়ে দেশ গণতন্ত্র সূচকে ২০০৬ সালের ইতিবাচক অবস্থানে ফিরতে পারেনি।

গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফ্রিডম হাউজের ‘ডেমোক্র্যাসি ইন রিট্রিট : ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদন ২০১৯-এ বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর ৪১। ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ স্কোর নেমে আসে ৩৯-এ। অর্থাৎ ২ পয়েন্ট পিছিয়ে যায় বাংলাদেশ।

গত এক দশক ধরে দেশ গণতন্ত্র সূচকে তলানিতে থাকার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. দুর্বল নির্বাচনী ব্যবস্থা। খ. গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সহাবস্থানে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। গ. রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ঘ. নাগরিক অধিকার।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দুর্বল পর্যায়ে রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। সর্বশেষ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে গত দশম সংসদ নির্বাচন (২০১৪) এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে (২০১৮)। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রায় ২৮টি রাজনৈতিক দল দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। অনেকটা অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এতে দেশের গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্টক্ষমতায় আসে।

শুধু যে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণহীন ও সুষ্ঠু হয়নি তা নয়, এ দুটি নির্বাচনের মধ্যবর্তী এবং একাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০১৫, পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২০ এবং সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

গত এক দশকে সরকার উন্নয়নমূলক কাজে তৎপর থাকলেও তারা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে তৎপর হয়নি। শাসক দলের যুক্তি-‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’। নির্ভেজাল গণতন্ত্র অনুসরণ করে যে উন্নয়ন করা যায়, বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে তার অকাট্য প্রমাণ মেলে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরুতেই সহিষ্ণুতা, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দেয়। দীর্ঘ ৫০ বছরে এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রাজনীতির মাঠের শত্রুতা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের, বিশেষ করে তিনটি বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকেও ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে।

সংবিধান স্বীকৃত জনগণের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আগেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এ ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত এক দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বেড়েছে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক গুম দিবস পালন উপলক্ষ্যে ১২টি হিউম্যান রাইটস গ্রুপের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫৭২ জন গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসেননি। তারা আদৌ ফিরে আসবেন কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।

সবশেষে বলতে চাই, উদার গণতান্ত্রিক সূচকে বাংলাদেশের মানোন্নয়নের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় সরকার যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলতে পারে সরকারকে এ তত্ত্বে বিশ্বাসী হতে হবে। নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে হবে। জনগণ দেখতে চায়, তাদের দেশ অদূর ভবিষ্যতে উদার গণতান্ত্রিক সূচকে সম্মানজনক অবস্থানে থাকবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

Advertisement

উদার গণতান্ত্রিক সূচক

Advertisement

আরও পড়ুন

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম