Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

সম্ভাবনাময় খাতটিতে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন

Advertisement

Icon

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সম্ভাবনাময় খাতটিতে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন

Advertisement

গত কয়েক বছরের মধ্যে গেল ঈদে সবচেয়ে কম পশু কুরবানি হয়েছে। করোনা সংক্রমণের আগে প্রতিবছর কুরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০১৯ সালে তা ১ কোটি ৬ লাখ ১৪ হাজারে ঠেকেছিল। এবারের তুলনায় গত বছর করোনা নিয়ে মানুষের ভয়ভীতি বেশি থাকার পরও এবার বিক্রি কম হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর কুরবানি উপলক্ষ্যে বিক্রয়যোগ্য ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার পশুর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি। অর্থাৎ কুরবানিযোগ্য ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৫২৩টি পশু এবার অবিক্রীতই থেকে গেছে। মহামারির মধ্যে বেচা-বিক্রি স্বাভাবিক রাখতে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ বিবেচনায় এবার সরাসরি হাটের পাশাপাশি অনলাইন হাটের ব্যবস্থাও সরকারের তরফ থেকে করা হয়।

দেশে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে যেমন সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস, ঠিক তেমনি এ দুই নগরীতে বিলাসী ও সামর্থ্যবান মানুষের সংখ্যাও অনেক। আর কুরবানির গরু ও অন্যান্য পশু এ শহর দুটোতে বিক্রিও হয় বেশি। তাই সঙ্গত কারণে উত্তরবঙ্গের বেপারি ও খামারিরা ট্রাকে করে গরু নিয়ে বেশি লাভের আশায় এ দুটি শহরেই আগে ছুটে আসেন।

কিন্তু বিধি বাম, করোনাকালের আগে হাটগুলো যেভাবে সরগরম ও ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত- এ বছর তা হয়নি, বিক্রি কম হয়েছে। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও বিক্রি না হওয়ায় শত শত ট্রাক, পিক-আপে হাজার হাজার গরু উত্তরবঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেপারিদের মতে, উত্তরবঙ্গ থেকে আসা গরুর অর্ধেকও বিক্রি হয়নি। তাদের লোকসান দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

শতকরা হিসাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খামারি ও বেপারি যথাক্রমে ২০-৩০ এবং ৭০-৮০ জন। অনলাইন প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা বেপারিরা শিক্ষিত তরুণ খামারিদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারেননি। করোনায় অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কুরবানি দিতে গেলে ন্যূনতম যে আর্থিক সচ্ছলতা থাকা দরকার তাও অনেকে হারিয়েছেন। বাসাবাড়ি ও হাসপাতালে করোনা রোগী নিয়েই অনেক পরিবার ব্যস্ত ছিল।

স্বজনের মৃত্যু, অসুস্থতায় কুরবানি দেওয়ার বিষয়ে অনেকেই মনোযোগ দিতে পারেননি। তাছাড়া ঈদের আগের দিনগুলোতে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি ছিল। পুরো দেশেই তখন করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই গরু কেনা, দেখভাল করা, কসাই ঠিক করা, সর্বোপরি বাসার চত্বরে কুরবানি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছেন। তাই যিনি একা আস্ত গরু ও ছাগল কুরবানি দিতেন, তিনি এবার অন্য কোথাও ভাগে কুরবানি দিয়ে নিজে নির্ভার থেকেছেন। ফলে বিপুলসংখ্যক পশু অবিক্রীতই থেকে গেছে।

অবিক্রীত গরুর অধিকাংশই বড় আকারের। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে, ‘রেডমিট’ ও চর্বিযুক্ত মাংস পারতপক্ষে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তাই পছন্দের তালিকায় বড় গরু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। একইভাবে কৃত্রিম উপায়ে স্বল্প সময়ে বড় করা গরুর প্রতি মানুষের ধারণা খুব একটা ইতিবাচক নয়। তারা মনে করেন, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করে এবং রাসায়নিক দ্রব্য খাইয়ে বড় করা গরুগুলো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তাই বড় গরু বিক্রি কম হওয়ার পেছনে এ কারণগুলোর ভূমিকা থাকতে পারে। বড় জাতের একেকটি গরুর পেছনে প্রতিদিন দুই-আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়। তাদের দামি দামি সব খাবার খাওয়াতে হয়। আবাসস্থল ছিমছাম ও পরিপাটি এবং গরম থেকে রক্ষার জন্য ফ্যানের ব্যবস্থা রাখতে হয়। অসুখ-বিসুখে ভেটেরিনারি চিকিৎসকসহ সারা বছর প্রাণিসম্পদ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়।

বাণিজ্যিকভিত্তিতে পদ্ধতিগতভাবে গবাদিপশু লালন-পালনের কার্যক্রম আমাদের দেশে খুব একটা পুরোনো নয়। ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী দেশের গরুর ওপর আমাদের ব্যাপক নির্ভরতা তো ছিলই, তাছাড়া বাইরের গরু ছাড়া কুরবানির ঈদ পার করা এক অসম্ভব ব্যাপার ছিল। আর সে জন্য আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে গরু বেচাকেনার বাজার ও খাটালগুলো সারা বছর সরগরম হয়ে থাকত।

ওই সময়গুলোতে বাইরের দেশ থেকে কুরবানির ঈদের আগে ২০-২২ লাখ গরু-ছাগল আসত এবং সারা বছরে এ সংখ্যা ৩০ লাখ অতিক্রম করত। পরবর্তীকালে গরু আসা বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে দেশে ব্যাপকভিত্তিক গরু লালন-পালন শুরু হলে এ খাতে নাটকীয় ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। গৃহস্থালি পর্যায়ে গরু-ছাগল লালন-পালন ছাড়াও দেশে কয়েক বছরের ব্যবধানে লাখ লাখ খামার গড়ে ওঠে।

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা বলেন, দেড় থেকে আড়াই বছরের গরুকে তিন-চার মাস বিশেষ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মোটাতাজা করার বিজ্ঞানসম্মত এ ব্যবস্থাটি আমাদের দেশে গ্রহণের আগে খুব অযত্ন-অবহেলায় গরু লালন-পালন করা হতো। কিন্তু পরে মোটাতাজা করার প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে এ খাতে প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরি হয়, যা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

সাধারণ বেপারিদের দুই, চার, পাঁচ, দশটি গরু নিয়ে আর বড় বড় উদ্যোক্তাদের খামার তৈরি করে শুরু হয় গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নতুন উদ্যোগ। বাইরে থেকে গরু আশা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রকারান্তরে আমাদের দেশের জন্য ভালোই হয়েছে। উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, তাদের মাথায় নতুন নতুন ধারণা আসছে, আর সে জন্যই গরু-ছাগল ছাড়াও আমাদের দেশে ভেড়া, দুম্বার খামার গড়ে উঠছে। এ খামারগুলোকে কেন্দ্র করে আরও বহু ধরনের সহায়ক ব্যবসা ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর এর প্রভাবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য বিমোচনের সম্ভাব্য যত পথ আছে, তার মধ্যে গবাদি পশুপালন অন্যতম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপকের গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঈদুল আজহায় পশু বিক্রি সংক্রান্ত গবেষণায় বলা হচ্ছে, গবাদিপশু বিক্রি গ্রামের অধিকাংশ মানুষের হাতে নগদ টাকার উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে একটি পরিবারের সারা বছরের নগদ টাকার চাহিদার একটা অংশ পূরণ হয়ে থাকে।

বেপারি ও খামারিরা দুটি পয়সা লাভের আশায় ঋণ নিয়ে গরু লালন-পালন করেন। তাদের টার্গেট থাকে কুরবানির ঈদ। কিন্তু সে আশার গুড়ে যখন বালি পড়ে, তখন এ কষ্ট সহ্য করা অসম্ভব হয়ে যায়। তাই তাদের সাহায্য করার জন্য ন্যায্যদামে সরকারের তরফ থেকে সেসব গরু ক্রয় করে এর মাংস বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে ওরা যেমন লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন, একইসঙ্গে রপ্তানির এ খাত অর্থনীতিকেও একটু মজবুত করবে।

বড় গরু লালন-পালন করতে বেপারি ও গৃহস্থকে অনেক ঝুঁকি পোহাতে ও অর্থ খরচ করতে হয়। তাই কুরবানির হাট থেকে ফেরত এনে পরবর্তী ঈদ পর্যন্ত এক বছর অপেক্ষা করা তাদের জন্য হতাশা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নৈমিত্তিক হাটে যথোপযুক্ত দামে এগুলো বিক্রিও করা যায় না। তারা দুটি পয়সা লাভের আশায় এগুলো বড় করেন। তাই উৎপাদনবান্ধব বাজার প্রবর্তন এবং যে ধরনের গরুর চাহিদা বেশি সে ধরনের গরু পালনে তাদের পরামর্শ দিতে হবে।

গবাদিপশু, বিশেষত কুরবানির গরু ও অন্যান্য প্রাণী পরিবহণের সার্বিক ব্যবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। গাদাগাদি করে তাদের ট্রাক, মিনি-ট্রাকে তোলা হয়। যানজটের কারণে ওই অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। রোদ ও বৃষ্টির মধ্যে অনেক সময় দীর্ঘ পথ হাঁটিয়েও আনা হয়। এরপর হাটেও তাদের রাখার ব্যবস্থা ভালো নয়। অনেক গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে, গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে মারাও যায়।

তাই পশু পরিবহণ ও হাটে থাকার ব্যবস্থা মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। পশু মৃত্যুজনিত মালিকের ক্ষতি লাঘবে এসব পশুকে ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনতে হবে। কিছু প্রাইভেট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে গৃহীত কার্যক্রমকে আরও প্রসারিত, বেগবান ও ত্বরান্বিত করতে হবে। সচ্ছলতার আশায় বেশিরভাগ উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদিপশু লালন-পালন করছেন। ঈদে অবিক্রীত কোনো পশুর বিপরীতে যদি কারও কোনো ঋণ থাকে, তবে সে ঋণ এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে যেন গৃহস্থ, বেপারি বা খামারি কাউকেই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালে গরু পালনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২ নম্বরে এবং লালন-পালনকৃত গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ। একই বছর ব্রাজিল ২১ কোটি ১৭ লাখ গরু পালনের মাধ্যমে শীর্ষস্থান দখল করে। ব্যাপক সম্ভাবনাময় এ খাতটিতে আমাদের মনোযোগ আরও বাড়াতে ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে; নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি সহায়তার হাত আরও প্রসারিত করতে হবে। সেদিন হয়তো দূরে নয়, যেদিন আমরা গবাদিপশু উৎপাদনে শীর্ষস্থানে পৌঁছতে পারব।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

Advertisement

কোরবানি পশু

Advertisement

আরও পড়ুন

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম