গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আর কত সময় প্রয়োজন?
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আর কত সময় প্রয়োজন?

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

২৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষ্যে ১০ নভেম্বর রাজধানীর জিরো পয়েন্টে নূর হোসেন স্কয়ারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার দল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে লড়াই করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া, এটি কোনো ম্যাজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন নয় যে, রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে।’ গত বছর একই দিনে নূর হোসেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে আমাদের বহু কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের শৃঙ্খলমুক্তি ঘটলেও গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের বিকাশমান ধারা অব্যাহত থাকবে।’

স্বাধীনতার পর থেকে মূলত তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করে আসছে। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় প্রায় ২৩ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটি বর্তমানেও ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি চার মেয়াদে ১৪ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে। তবে জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠার আগে সামরিক পোশাকে প্রায় দু’বছর দেশ শাসন করেছেন। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করেছে পাঁচ বছর। তবে এইচএম এরশাদ দলটি প্রতিষ্ঠার আগে সামরিক পোশাকে চার বছর দেশ শাসন করেছেন। দেশ শাসনকারী এ তিনটি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আন্তরিক হয়নি। একটানা দীর্ঘ ১৪ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি যখন বলেন, ‘গণতন্ত্র একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া, এটি কোনো ম্যাজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন নয় যে, রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে’, তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-এ প্রক্রিয়া সম্পন্নে তথা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আর কত সময় প্রয়োজন? গত ১৪ বছরে ক্ষমতাসীন দলটির কার্যক্রম গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে কতটা সহায়ক ছিল?

গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে প্রয়োজনীয় শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে-ক. সংবিধানের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি অক্ষুণ্ন থাকা; খ. শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর; গ. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখা; ঘ. মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এগুলোর অভাব আগেও ছিল, এখনো আছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে (যা মূল সংবিধান নামে পরিচিত) বলা হয়, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে (অনুচ্ছেদ ১১)। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিতে সংবিধানে এরূপ সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান গৃহীত হওয়ার তিন বছর পার হতে না হতেই আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় সরকারব্যবস্থা চালু করলে গণতন্ত্র উধাও হয়ে যায়। সত্তরের দশকের দ্বিতীয় ভাগে এবং আশির দশকে দেশে গণতন্ত্র কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাছাড়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খোলসে দু’বছর (২০০৭ ও ২০০৮) সামরিক শাসন চলাকালে গণতন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে। রাজনীতিকদের মধ্যে সৃষ্ট পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে প্রবর্তিত হয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তা বর্তমানে আরও জোরদার হয়েছে। বর্তমানে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত বিধান প্রবর্তন করে। সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুসারী কোনো দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে বলে জানা নেই।

বাংলাদেশের পাঁচ দশকের ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের নজির খুবই কম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে ৮৩ দিনের মাথায় ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় মোশতাক সরকার। ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ঘটা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ৮ নভেম্বর এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। অতঃপর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য তিন বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব ও রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর বিচারপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। অভিযোগ রয়েছে, জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বিচারপতি সায়েমকে বাধ্য করেন। ওই বছরের ৩০ মে জিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে আস্থা গণভোটের আয়োজন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ফলাফল ছিল ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১.১ শতাংশ ‘না’ ভোট। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে এ পদে নিয়মিত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ চিফ অব আর্মি স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচএম এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে বিএনপি সরকারের পতন ঘটান। তিনি প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরে তার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক শাসনকে বৈধতা দানের জন্য এইচএম এরশাদও গণভোট আয়োজন করেছিলেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪.৫ শতাংশ। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এইচএম এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের পতন হলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সংবিধানস্বীকৃত নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ছিল। এগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা আটটি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়। এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। এ দুটি সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হয়।

গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নাধীন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, নির্দলীয় সরকারের সময়কালের চারটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও দলীয় সরকারের সময় দায়িত্ব পালনরত ইসিগুলো সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় মনোভাব পোষণ না করায় এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি দুর্বল থাকায় তাদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সাতটি সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের, বিশেষ করে ইসির পক্ষে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব নির্বাচনে প্রশাসন ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থে কাজ করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের একটানা ১৪ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশ সরকারের আনুকূল্যে অপ্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে দলটির অনুরক্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ আছে। ফলে তারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের পরিবর্তন চাইবেন না। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ইসির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।

দেশে মৌলিক অধিকার আগেও লঙ্ঘিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে; তবে গত কয়েক বছরে অবস্থার অবনতি হয়েছে। দেশে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সংবিধান মানুষের জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বিভিন্নভাবে এগুলোর কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যমকর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনা হচ্ছে। জনগণ ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো, স্বাধীনতার ৫১ বছরে দেশ শাসনকারী তিনটি দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিগত ১৪ বছরের একটানা শাসনকালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রধান হাতিয়ার নির্বাচনব্যবস্থা (জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে) দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং গণতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা পালনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা হয়েছে প্রশ্নের সম্মুখীন। গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সূচকে আমাদের অবস্থান ক্রমাগত খারাপের দিকে গেয়ে। যেখানে ২০০৬ সালে দেশের অবস্থান ছিল ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে, সেখানে বর্তমানে এ অবস্থান এক ধাপ নিচের হাইব্রিড রেজিম বা মিশ্র ক্যাটাগরিতে। তাই আর সময়ের অজুহাত না দেখিয়ে দলটির উচিত হবে গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে উদ্যোগী হওয়া।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আর কত সময় প্রয়োজন?

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
২৩ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষ্যে ১০ নভেম্বর রাজধানীর জিরো পয়েন্টে নূর হোসেন স্কয়ারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার দল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে লড়াই করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া, এটি কোনো ম্যাজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন নয় যে, রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে।’ গত বছর একই দিনে নূর হোসেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে আমাদের বহু কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের শৃঙ্খলমুক্তি ঘটলেও গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের বিকাশমান ধারা অব্যাহত থাকবে।’

স্বাধীনতার পর থেকে মূলত তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করে আসছে। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় প্রায় ২৩ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটি বর্তমানেও ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি চার মেয়াদে ১৪ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে। তবে জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠার আগে সামরিক পোশাকে প্রায় দু’বছর দেশ শাসন করেছেন। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করেছে পাঁচ বছর। তবে এইচএম এরশাদ দলটি প্রতিষ্ঠার আগে সামরিক পোশাকে চার বছর দেশ শাসন করেছেন। দেশ শাসনকারী এ তিনটি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আন্তরিক হয়নি। একটানা দীর্ঘ ১৪ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি যখন বলেন, ‘গণতন্ত্র একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া, এটি কোনো ম্যাজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন নয় যে, রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে’, তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-এ প্রক্রিয়া সম্পন্নে তথা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আর কত সময় প্রয়োজন? গত ১৪ বছরে ক্ষমতাসীন দলটির কার্যক্রম গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে কতটা সহায়ক ছিল?

গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে প্রয়োজনীয় শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে-ক. সংবিধানের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি অক্ষুণ্ন থাকা; খ. শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর; গ. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখা; ঘ. মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এগুলোর অভাব আগেও ছিল, এখনো আছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে (যা মূল সংবিধান নামে পরিচিত) বলা হয়, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে (অনুচ্ছেদ ১১)। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিতে সংবিধানে এরূপ সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান গৃহীত হওয়ার তিন বছর পার হতে না হতেই আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় সরকারব্যবস্থা চালু করলে গণতন্ত্র উধাও হয়ে যায়। সত্তরের দশকের দ্বিতীয় ভাগে এবং আশির দশকে দেশে গণতন্ত্র কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাছাড়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খোলসে দু’বছর (২০০৭ ও ২০০৮) সামরিক শাসন চলাকালে গণতন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে। রাজনীতিকদের মধ্যে সৃষ্ট পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে প্রবর্তিত হয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তা বর্তমানে আরও জোরদার হয়েছে। বর্তমানে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত বিধান প্রবর্তন করে। সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুসারী কোনো দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে বলে জানা নেই।

বাংলাদেশের পাঁচ দশকের ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের নজির খুবই কম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে ৮৩ দিনের মাথায় ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় মোশতাক সরকার। ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ঘটা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। ৮ নভেম্বর এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। অতঃপর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য তিন বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব ও রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর বিচারপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। অভিযোগ রয়েছে, জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বিচারপতি সায়েমকে বাধ্য করেন। ওই বছরের ৩০ মে জিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে আস্থা গণভোটের আয়োজন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ফলাফল ছিল ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১.১ শতাংশ ‘না’ ভোট। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে এ পদে নিয়মিত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ চিফ অব আর্মি স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচএম এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে বিএনপি সরকারের পতন ঘটান। তিনি প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরে তার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক শাসনকে বৈধতা দানের জন্য এইচএম এরশাদও গণভোট আয়োজন করেছিলেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪.৫ শতাংশ। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এইচএম এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের পতন হলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সংবিধানস্বীকৃত নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ছিল। এগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা আটটি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। এতে ওই নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়। এ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের গুটিকয়েক সহযোগী দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান। এ দুটি সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হয়।

গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নাধীন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, নির্দলীয় সরকারের সময়কালের চারটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও দলীয় সরকারের সময় দায়িত্ব পালনরত ইসিগুলো সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় মনোভাব পোষণ না করায় এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি দুর্বল থাকায় তাদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সাতটি সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের, বিশেষ করে ইসির পক্ষে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব নির্বাচনে প্রশাসন ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থে কাজ করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের একটানা ১৪ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশ সরকারের আনুকূল্যে অপ্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে দলটির অনুরক্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ আছে। ফলে তারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের পরিবর্তন চাইবেন না। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ইসির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।

দেশে মৌলিক অধিকার আগেও লঙ্ঘিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে; তবে গত কয়েক বছরে অবস্থার অবনতি হয়েছে। দেশে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সংবিধান মানুষের জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বিভিন্নভাবে এগুলোর কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যমকর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনা হচ্ছে। জনগণ ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

উপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো, স্বাধীনতার ৫১ বছরে দেশ শাসনকারী তিনটি দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়নি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিগত ১৪ বছরের একটানা শাসনকালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রধান হাতিয়ার নির্বাচনব্যবস্থা (জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে) দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং গণতন্ত্রের বিকাশে ভূমিকা পালনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা হয়েছে প্রশ্নের সম্মুখীন। গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সূচকে আমাদের অবস্থান ক্রমাগত খারাপের দিকে গেয়ে। যেখানে ২০০৬ সালে দেশের অবস্থান ছিল ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে, সেখানে বর্তমানে এ অবস্থান এক ধাপ নিচের হাইব্রিড রেজিম বা মিশ্র ক্যাটাগরিতে। তাই আর সময়ের অজুহাত না দেখিয়ে দলটির উচিত হবে গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে উদ্যোগী হওয়া।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন