Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

আন্দোলনে কার লাভ কার ক্ষতি

Advertisement

Icon

মো. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আন্দোলনে কার লাভ কার ক্ষতি

Advertisement

কিছুদিন আগে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এরপর এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে টানা বিক্ষোভ, সহিংসতা, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি-সব মিলে জীবনযাত্রা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। ১৬ থেকে ২১ জুলাই বাংলাদেশে যে নজিরবিহীন বিক্ষোভ আর সহিংস আন্দোলন হয়েছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনোই দেখা যায়নি। এত কম সময়ের মধ্যে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং অনেকের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যদিওবা কোর্টের রায় ও সামরিক বাহিনীর অবস্থানের মধ্য দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর এ পরিস্থিতির আপাত অবসান হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে এতগুলো তাজা প্রাণ অকালে ঝরে পড়া এবং এর ফলে তাদের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী এরশাদ সরকারের আমলে মজিদ খান কমিশনের বিরুদ্ধে সূচিত ছাত্র আন্দোলনই আশির দশকজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। এছাড়া ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীর বিচারে জোরালো রাজনৈতিক আন্দোলন, ২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনও ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করায় তৎকালীন শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এদেশে ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। ছাত্রদের দাবির মুখেই ইতিহাসে প্রথম এবারই কারফিউর মধ্যেও সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম বসেছিল কোটা সংস্কার করতে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ; মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সাধারণ মেধা তালিকা থেকে তা পূরণ করা হবে। প্রকৃতপক্ষে, সরকারি চাকরিতে যোগদানে এখন কোটা পদ্ধতি নেই বললেই চলে। কেননা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা এখন এর আওতাভুক্ত থাকছে না। তবে রাজনৈতিক চক্রান্তে ছাত্রদের আন্দোলন যে সহিংস রূপ নিল, তা খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে নাশকতা করে। টার্গেট করে তাণ্ডব ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয় মেট্রো রেলস্টেশন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু ভবনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা যোগাযোগব্যবস্থা, স্থবির হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতি। ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ। মূলত, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এদেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থে গড়ে তোলা সম্পদ, মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। এসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে একান্তই দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষ।

বিগত কয়েক দিনে উৎপাদনব্যবস্থা, পরিষেবা এবং ব্যবসা খাতে ব্যাঘাতের ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গত এক সপ্তাহে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তার মতে, চলমান স্থবিরতায় প্রতিদিন অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

নাজুক এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর একটি আন্তর্জাতিক দিক রয়েছে। কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সত্য-মিথ্যামিশ্রিত তথ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এটি অদূরভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগসহ ভূরাজনৈতিক ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতি সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিকে উদাহরণ হিসাবে দেখা যেতে পারে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ জুলাই আরব আমিরাতের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ওই বিক্ষোভের দায়ে ২২ জুলাই ৫৭ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির সরকার। এর একদিন পরই বাংলাদেশিদের জন্য সাময়িকভাবে ভিসা বন্ধের ঘোষণা দিল দেশটি।

অস্থিতিশীল পরিবেশে দেশের জানমাল ও ভাবমূর্তির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, এর দায় কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। সব পক্ষকে একে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোয় সরকারের পক্ষ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ আমরা প্রত্যাশা করব। অন্যদিকে, ছাত্রদেরও বুঝতে হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং সংযমের পথ অবলম্বন করেও দাবি আদায় সম্ভব। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের মূল দাবিটি পূরণ হয়েছে, সামনে অন্য যৌক্তিক দাবিগুলোও পূরণ করা হবে বলে সবাই আশাবাদী। সরকারের উচিত হবে প্রতিটি হত্যার ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা। পাশাপাশি যারা নাশকতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রের সম্পদ ও সম্পত্তিতে আঘাত হেনেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। উভয়পক্ষকে দেশ ও দশের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এ পরিস্থিতির সুরাহায় সবাইকে কঠোর মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আন্দোলন বা বাধা প্রদানের মাধ্যমে কখনোই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। ধ্বংস ও সহিংসতা কখনো দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। সংলাপ ছাড়া এর বিকল্প কোনো সমাধান নেই। এছাড়া জনজীবন স্বাভাবিক করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কোনো সাধারণ মানুষ কিংবা শিক্ষার্থী যেন হতাহতের শিকার না হয়, সে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে। কারও উসকানি কিংবা মদদে দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার কোনো মানে হয় না।

মো. সাখাওয়াত হোসেন : সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

Advertisement

সরকারি চাকরি

Advertisement

আরও পড়ুন

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

মা দুর্গার আগমন

মা দুর্গার আগমন

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

দেবীশক্তির জাগরণ : মহালয় থেকে পূর্ণিমা

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

মৃন্ময়ী অবয়বে চিন্ময়ী সত্তার বিকাশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম