তন্ত্র নাশের মন্ত্র কী?
Advertisement
মুঈদ রহমান
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত দু’সপ্তাহের বাংলাদেশকে চিনতে কষ্ট হচ্ছে। মনেই হচ্ছে না যে, দেশে কোনো শাসনব্যবস্থা আছে। চারদিকে হতাশা আর নিরাশার অন্ধকার; ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারছে না কেউ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মতো একটি যৌক্তিক দাবির বিপরীতে জানমালের এত বড় ক্ষয়ক্ষতি কল্পনার বাইরে ছিল। আন্তর্জাতিক সমাজ বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি তার একটি নিবন্ধে বলেছেন, যে সরকার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাকে ব্যর্থ সরকার বলতে হবে। আমাদের এ পরিস্থিতিতে যে সরকার ক্ষমতায় আছে, সেটি কোন ধরনের সরকার, তা বিচারের ভার রইল সচেতন নাগরিকদের ওপর। তবে এ ঘটন-অঘটনগুলোর সম্পূর্ণ দায় বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ওপরই বর্তায়।
কোটা সংস্কারের মতো একটি মামুলি বিষয়ের নিষ্পত্তি না করে ক্ষমতার দাম্ভিকতার কারণে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে দেশকে। মধ্য জুলাই থেকে যেসব হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী সংঘটিত হয়েছে, তা বহুমাত্রিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের যে কোনো সময়কে হার মানিয়েছে। সরকারি হিসাব মতেই নিহতের সংখ্যা ১৫০। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, এ সংখ্যা ২৫০-এর কম নয়। আমরা যদি সরকারি হিসাবকেও আমলে নিই, তাহলেও বলতে হবে এ প্রাণহানি স্বাধীন বাংলাদেশের যে কোনো আন্দোলনে প্রাণহানিকে তুচ্ছ করেছে। চলমান হত্যাকাণ্ডের আরেকটি দিক হলো মৃতের ধরন। এখানে বেশির ভাগই কোমলমতি শিক্ষার্থী; সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন পেশার মানুষ, এমনকি বাড়ির মতো নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা চার বছরের শিশুও ঘাতকের শিকার হয়েছে। এ শত শত প্রাণ ও কোটি কোটি টকার সম্পদের দায় বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। এত বড় জানমালের দায় বিগত পাঁচ দশকের কোনো সরকারের ঘাড়ে চাপেনি।
অনেকেই মনে করেন, সামান্য কোটা সংস্কারের সমস্যাটা ১০ মিনিটেই সমাধানযোগ্য ছিল, এত প্রাণহানির প্রয়োজন ছিল না। এটি খুব সাধারণ অর্থে সত্যি। ক্ষমতার দাপটে থাকা কোনো শাসকের বেলায় তা সত্যি নয়। যিনি শাসন ক্ষমতায় আছেন, তিনি কোনো ধরনের যৌক্তিক দাবি শুনতে নারাজ। অবশ্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কিছুটা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে সরকার। কিন্তু ততক্ষণে রাষ্ট্র ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কি শুধুই সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে? এদেশে কর্মজীবীর সংখ্যা সাত কোটি ৫০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে সরকারি কর্মজীবীর সংখ্যা ১২ লাখের মতো। শূন্য পদ আছে তিন লাখ, মোট ১৫ লাখ। সুতরাং এ ক্ষুদ্র আকারের সুযোগের কারণে এমনতর বিক্ষুব্ধ নয় তারা। বহুমাত্রিক বঞ্চনা শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ করেছে। আবাসিক হলগুলোতে সরকারি দলের নিপীড়ন, সিট বাণিজ্য, জবরদস্তি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক আধিপত্যসহ সব বঞ্চনার সমাহার ঘটেছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। গত ১০ বছর ধরে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বচাপে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না; এর প্রতিবাদও করতে পারছিল না। আজ তারা সেই সুযোগটি নিয়েছে। মানুষকে দাবিয়ে, মানুষের কথা উপেক্ষা করে, জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে বেশি দিন শাসন ক্ষমতায় থাকা যায় না। সরকার যদি এ সত্যটি আজও উপলব্ধি করতে না পারে, তাহলে তা দুঃখজনক এবং এর পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হবে।
সরকারের বাড়াবাড়ির কারণে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনে। এত প্রাণের বিসর্জন না হলে হয় তো এতদূর এগোত না। আজকের প্রজন্ম মনে করে এই যে এত রক্তপাত, এর সুষ্ঠু বিচার এ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কেননা, তারা নিজেরাই এ রক্তক্ষয়ের জন্য দায়ী। তাই তারা শাসকশ্রেণি ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়; সেই দাবিতেই রাজপথে অবস্থান নিয়েছে। এর সমর্থনে সম্পৃক্ত হয়েছে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষ। চিন্তার স্বাধীনতার প্রশ্নে, মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে, দম আটকানো রাজনৈতিক পরিবেশের প্রশ্নে সাধারণ মানুষ এখন একটি সন্তোষজনক উত্তর চায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে জেগে উঠেছে, তা হলো সরকার কি পারবে এ অচলাবস্থা দূর করতে? এর সরাসরি উত্তর দেওয়া যাবে না। তবে খুব সহজে বলা যায় যে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থা ২০২৪ সালের জন্য প্রযোজ্য নয়। আজ থেকে এক দশক আগে মানুষের মনে একটি স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। সে স্বপ্নটি হলো ‘উন্নয়নের রোল মডেল’। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। এক দশক পর মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, এ উন্নয়ন হচ্ছে গুটিকতক মানুষের পকেট ভারী করার উন্নয়ন। উন্নয়নের কোনো আর্থিক সুবিধাই এদেশের সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারেনি। এ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে এদেশের মানুষ হারিয়েছে কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার আর ন্যায্য দাবি আদায়ের অধিকার। তাই আমজনতা আজ তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। অন্য দিকটি হলো আস্থা হারানো। আজ থেকে ১০ বছর আগে সরকারি মহলের ওপর মানুষের যে আস্থা ছিল, তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাদের মুখ থেকে যদি কোনো সত্য বাণীও প্রচারিত হয়, তাও মানুষ এখন আর বিশ্বাস করছে না।
সরকারের শেষ হাতিয়ারটি হলো ‘মুক্তিযুদ্ধ’। এটি এখন আর কোনো কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য হাতিয়ার নয়। ছাত্রসমাজের বহন করা জাতীয় পতাকা, প্ল্যাকার্ড, স্লোগানের ভাষা, তাদের সমর্থনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর গাওয়া গণসংগীত ইত্যাদি কোনোটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোনো লক্ষণ নয়, বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের যে অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার, তা বহন করে। যাকে তাকে যখন তখন রাজাকার বানিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি এখন অনেকটাই অচল। তাছাড়া এ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তারা স্বাধীনতার সনদ পড়েছে, যার ভিত্তি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এ সনদ থেকেই রচিত হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান, যার মূলমন্ত্র হলো : জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-তাও তারা জানে। দাদাকে আদা পড়া দিলে তো চলবে না।
এ প্রজন্ম নিশ্চিতভাবে জানে, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করার নাম মুক্তিযুদ্ধ নয়; তারা জানে, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট করার নাম মুক্তিযুদ্ধ নয়; তারা জানে বেনজীর-মতিউর-আবেদ আলী তৈরির নাম মুক্তিযুদ্ধ নয়; তারা জানে রাতের অন্ধকারে নির্বাচন করার নাম মুক্তিযুদ্ধ নয়। তারা নিজের স্বার্থে নয়, জাতীর স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে চায়। সুতরাং ক্ষমতাসীন দলের জন্য আজকের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আগের মতো সহজ হবে না।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আজ গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তারা মনে করে ভয়ের দিন শেষ। আজকের শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলুন, স্বৈরতান্ত্রিক বলুন, যাই বলুন না কেন, এর অবসান চায়। তবে সেক্ষেত্রে একটাই প্রশ্ন-তন্ত্র নাশের মন্ত্র কী?
মুইদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
