মোহাম্মদ হোসেন খসরু
শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপাল
Advertisement
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু। তিনি ছিলেন শচীন দেব, সন্ধ্যা মুখার্জি ও আবদুল আলীমের মতো বিখ্যাত সংগীতজ্ঞদের শিক্ষক। তার গানের আসরে যোগ দিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ বহু গুণিজন। এ মহান সুরসাধকের জন্ম ১৯০৩ সালের ৭ এপ্রিল কুমিল্লা শহরের বিখ্যাত দারোগা বাড়িতে। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘খুশু মিয়া’ নামে পরিচিত। তার বাবা জায়েদুল হোসেনও ছিলেন একজন সংগীত অনুরাগী ও শৌখিন বংশীবাদক।
ওস্তাদ খসরু ১৯১৮ সালে দুই বিষয়ে লেটারসহ কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স (এসএসসি) পাশ করেন। ১৯২৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। পরে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এ সময় তিনি সংগীত জগতে ডুবে যান। তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত ওস্তাদ তানসেনের বংশধর ওয়াজির খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। উত্তর ভারতের রামপুর রাজ্যের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ মেহেদী হাসান খান খসরুর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাকে শিষ্যত্বে বরণ করেন। খসরু তার কাছে ধ্রুপদ, ধামার, হোরি, মাদ্রা সংগীতের ওপর প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
১৯২৮ সালে তিনি লক্ষ্ণৌতে ওস্তাদ নাছির উদ্দিন খানের কাছে ধ্রুপদ, ওস্তাদ কালে খাঁর কাছে টপ্পা, ওস্তাদ মামিদ খানের কাছে তবলা, ওস্তাদ করিম খাঁ ও ওস্তাদ মঈজউদ্দিন খাঁর কাছে ঠুমরি শেখেন। ওস্তাদ উজির খাঁ, মোহাম্মদ আলী খাঁ, জদ্দন বাঈ, আল্লাদিয়া খাঁ ও বাদল খাঁর কাছে শেখেন খেয়াল। যন্ত্রসংগীত-তবলা, সেতার, এস্রাজেও তিনি সমভাবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে তিনি ‘ওস্তাদ’ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গেও তার আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সংগীতে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য আলাউদ্দিন খাঁ তাকে ‘দেশমণি’ খেতাবে ভূষিত করেন।
এর আগে ওস্তাদ খসরু ১৯৩২ সালে সমবায় দপ্তরের অডিটর হিসাবে নারায়ণগঞ্জে চাকরিতে যোগদান করেন। ওই বছরের শেষের দিকে ময়মনসিংহে বদলি হন। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতায় বদলি হন। ১৯৪৪ সালে তিনি নিখিল বঙ্গ ও নিখিল ভারত মিউজিক কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ওস্তাদ খসরু দিল্লি ও কলকাতা বেতারের নিয়মিত গায়ক ছিলেন। বোম্বে, লক্ষ্ণৌসহ ভারতের সংগীতের এমন কোনো তীর্থস্থান নেই, যেখানে তার পদচিহ্ন পড়েনি। দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রশিক্ষক হিসাবে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। তিনি বাংলা, উর্দু ও হিন্দি ভাষায় গান ও গজল রচনা করতেন। এমনকি ইংরেজি ভাষায়ও গান রচনা করতেন। অসাধারণ ছিল তার রচনা ক্ষমতা। উচ্চাঙ্গসংগীত ছাড়াও গজল, হামদ, নাত, মুর্শিদি, মারফতি, ভজন, কীর্তন, লোকগীতি, পল্লীগীতি ও আধুনিক গানে তিনি পারদর্শী ছিলেন।
সংগীতের পাশাপাশি নৃত্যেও তার দখল ছিল। বিখ্যাত কথ্যক নৃত্যশিল্পী বেলা অর্ণভ, মাদাম সিমকি, মঞ্জুলিকা ভাদুড়িসহ অনেকেই তার শিষ্য ছিলেন। এ ছাড়া ওস্তাদ খসরু যেসব ছাত্রছাত্রীকে সংগীত শিক্ষা দেন তাদের মধ্যে রয়েছেন-ময়মনসিংহের পূর্ণেন্দু নন্দী (পচা নন্দী), বিজয় ভট্টাচার্য, কালু সেন, সমরেশ চৌধুরী, বিজন বালা, ঘোষ দস্তিদার (কালি) ও আবদুল খালেক। তার অন্যান্য শিষ্যের মধ্যে রয়েছেন-কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শচীন দেব বর্মণ, হিমাংশু দত্ত, ওস্তাদ সমরেন্দ্র পাল, মায়া দেবী, বেলা মুখার্জি, শেফালি সেনগুপ্তা, জ্ঞানদত্ত, বেচু দত্ত, সন্ধ্যা মুখার্জি, আমীর জুম্মন খান, মোশারফ হোসেন, বিশ্বনাথ ও শোভা চক্রবর্তী।
কলকাতা, ঢাকা, কুমিল্লা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চল মুখরিত থাকত তার সুরঝঙ্কারে। ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরার মহারাজ একসময় তাকে তাদের দরবারে সংগীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জীবনের শেষদিকে তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমির অধ্যক্ষ ছিলেন।
কুমিল্লা নগরীর দারোগা বাড়িতে কবি নজরুল ১৯২১, ১৯২২, ১৯২৩ সালে তার গানের মজলিসে যোগ দিয়েছিলেন। এ বাড়ির শ্বেতপাথরে তা লেখা রয়েছে। এ বাড়ির সামনে গাছতলায় অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, অধ্যাপক সুধীর সেন ও সাহিত্যিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার কাছে রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন।
ওস্তাদ খসরু ১৯৫৪ সালে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ১৯৫৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দারোগা বাড়ির একটি কক্ষে বসে থাকতেন। সেখানে বসেই পরিবারের ছেলেমেয়েদের হারমোনিয়াম ও তবলা শেখাতেন। ১৯৫৯ সালের ৭ আগস্ট দারোগা বাড়িতেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার লাশ এ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ১৯৬০-৬১ সালে তাকে মরণোত্তর ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়া হয়।
কুমিল্লার ইতিহাসবিদ আহসানুল কবীর বলেন, ‘অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সুরসাধক ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু। তিনি কুমিল্লার একজন আলোকিত সন্তান’।
