ঈদুল আজহার আট সিনেমা
মাঠের লড়াইয়ে কে এগিয়ে
চলতি বছর ঈদুল আজহায় দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে আটটি নতুন বাংলা সিনেমা-‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘বনলতা সেন’, ‘মাসুদ রানা’, ‘পিনিক’, ‘তছনছ’ এবং ‘অফিসার’। ঈদের বাজারে এত বৈচিত্র্যময় লাইনআপ অনেকদিন দেখা যায়নি। কোথাও তারকা খচিত বাণিজ্যিক আয়োজন, কোথাও শিল্পধর্মী গল্প বলার চেষ্টা, আবার কোথাও অ্যাকশন আর থ্রিলারের ঝাঁজ। একইসঙ্গে পশু কুরবানির মতো নিজেদের সিনেমাকেও কুরবানি দিতে আগে দেখা যায়নি নির্মাতা-প্রযোজকদের। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কথিত আছে, ঢাকাই সিনেমা এখনো ঈদকেন্দ্রিক। শুধু ঈদেই ভালো গল্প কিংবা বিগ বাজেটের আলোচিত সিনেমাগুলো মুক্তির লড়াইয়ে থাকে। বছরের অন্য সময় প্রেক্ষাগৃহ থাকে ফাঁকা, নতুন সিনেমাহীন। কিন্তু গত বছর থেকে ঈদেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না কোনো সিনেমা। বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রির বড় তারকাখ্যাত শাকিব খান, যিনি শুধু ঈদেই লড়াইয়ে নামেন, তিনিও চলতি বছর থেকে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছেন না। এর জন্য দায়ী খোদ নির্মাতা-প্রযোজকরা। ঈদ উৎসবে ছোট ইন্ডাস্ট্রিতে হাতেগোনা শখানেক প্রেক্ষাগৃহে অত্যধিক সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়। বলা যায় সবকটির জন্যই বিপদ ডেকে আনা। আর হচ্ছেও তাই। গত রোজার ঈদের মতো এবারের কুরবানির ঈদেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। গতি হারিয়েছে শাকিব খানেরসহ সবকটি সিনেমা।
* রকস্টার : তারকার জৌলুস আছে, কিন্তু নতুনত্ব নেই
শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’ ছিল ঈদের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা। প্রচারণা, জমকালো গান আর বাণিজ্যিক উপাদান- কোনো কিছুরই ঘাটতি ছিল না এতে। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি শাকিব খানের উপস্থিতি। পর্দায় তিনি এখনো দর্শক টানতে জানেন। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে সিনেমাটি খুব বেশি চমক দেখাতে পারেনি। অনেক জায়গায় পরিচিত ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। মিউজিক নিয়ে সিনেমা, অথচ এর গানগুলোও খুব একটা শ্রোতা-দর্শক জমাতে পারেনি। আজমান রুশো পরিচালিত এ সিনেমায় শাকিবকে সঙ্গ দিয়েছেন তিন নায়িকা-সাবিলা নূর, তানজিয়া জামান মিথিলা ও সুনিধি নায়েক। তবু গতি হারাতে হয়েছে শাকিবকে। বিশ্লেষকদের মতে, গান এবং চিত্রনাট্য আরও শক্তিশালী হলে সিনেমাটি অন্য উচ্চতায় যেতে পারত।
* রইদ : ধীরগতির গল্পে দর্শক হারিয়েছেন ধৈর্য
মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সম্ভবত এই ঈদের সবচেয়ে আলোচিত সমালোচকপ্রিয় ছবি। গ্রামীণ জীবনের নিঃসঙ্গতা, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানুষের ভেতরের নীরব যন্ত্রণাকে অত্যন্ত সংযতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এটি সবার জন্য সহজ সিনেমা নয়। ধীরগতির গল্প বলার কারণে অনেক দর্শক ধৈর্য হারিয়েছেন। কিন্তু যারা ভিন্নধর্মী সিনেমা পছন্দ করেন, তাদের জন্য ‘রইদ’ একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। তবে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি অভিনীত এ সিনেমা বিদেশে পুরস্কার পেলেও বাংলাদেশে আম-জনতার মন ভরাতে পারেনি।
* মালিক : শক্তিশালী শুরু, দুর্বল সমাপ্তি
আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম অভিনীত মালিক শুরু থেকেই একটি রাজনৈতিক-অ্যাকশন ড্রামার আবহ তৈরি করে। সিনেমার প্রথমার্ধ বেশ টানটানই ছিল বলা যায়। শুভর অভিনয়ও অনেকটা পরিণত। সমস্যা শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। গল্প দ্রুত এগোতে গিয়ে অনেক জায়গায় বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। কয়েকটি আবেগঘন দৃশ্য ভালো কাজ করলেও চিত্রনাট্যের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি গতি আটকে দেয়। তবু সাইফ চন্দন পরিচালিত এ সিনেমা অ্যাকশনপ্রেমীদের জন্য কিছুটা উপভোগ্য ছিল বলা যায়।
* বনলতা সেন : কবিতার মতো সুন্দর, কিন্তু ধীর
জীবনানন্দ দাশের কবিতার অনুপ্রেরণায় মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘বনলতা সেন’ একেবারেই ভিন্ন মেজাজের সিনেমা। এখানে গল্পের চেয়ে অনুভূতির গুরুত্ব বেশি। চিত্রগ্রহণ, সংগীত এবং পরিবেশ নির্মাণ সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে সাধারণ দর্শকের কাছে ‘রইদ’-এর মতো এ সিনেমাটিও কিছুটা ধীর মনে হয়েছে। যারা দ্রুতগতির বিনোদন খোঁজেন, তারা হতাশ হয়েছেন সিনেমাটি দেখে। তবে, যারা নীরব সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভালোবাসেন তারা খায়রুল বাসার, সোহেল মন্ডল, নাজিবা বাশার, রুপন্তী অভিনীত এ সিনেমাটি দেখে হতাশ হননি, এটা বলা যায়।
* মাসুদ রানা : স্বপ্ন বড়, বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ
কাজী আনোয়ার হোসেন রচিত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় গুপ্তচর চরিত্রকে বড় পর্দায় আনার চেষ্টা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। ‘মাসুদ রানা’ সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল সাহসের সঙ্গে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ভালো ছিল। কিছু দৃশ্যে আন্তর্জাতিক মানের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। কিন্তু নির্মাতা সৈকত নাসির চরিত্র নির্মাণ ও সংলাপে খুব বেশি যত্ন নেননি মনে হয়। তাই সোহেল রানা, পূজা চেরি ও সৈয়দা তিথি অমনি অভিনীত এ সিনেমাটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও, পূর্ণতা পায়নি কোনোভাবেই।
* পিনিক : বিনোদন আছে, গভীরতা কম
আদর আজাদ ও শবনম বুবলী অভিনীত পিনিক পুরোপুরি একটি বাণিজ্যিক বিনোদনধর্মী ছবি। হাস্যরস, রোমান্স এবং অ্যাকশনের মিশেলে নির্মিত এই সিনেমা দেখে দর্শক বিরক্ত হননি এটা ঠিক, কিন্তু গল্পের গভীরতা ছিল খুব সীমিত। অনেক দৃশ্য প্রেক্ষাগৃহে বসে দর্শক আগে থেকেই অনুমান করে ফেলেছেন, পরে কী হবে। ফলে সিনেমাটি দেখার সময় মজা পাওয়া গেলেও প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়ার পর খুব বেশি মনে থাকেনি কারও। ফলে জাহিদ জুয়েল পরিচালিত এ সিনেমা ঈদের পরে আলোচনার টেবিলেও নেই।
* তছনছ : উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, ছন্দ ছিল না
বদিউল আলম খোকন পরিচালিত ‘তছনছ’ একটি অন্ধকার ও আবেগনির্ভর গল্প বলতে চেয়েছে। সিনেমার বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় হলেও নির্মাণে যথেষ্ট অসংগতি রয়েছে। কিছু দৃশ্য ছিল শক্তিশালী, আবার কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ। ফলে পুরো সিনেমাটি একটি সমন্বিত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে মুন্না খান ও ববি হক অভিনীত এ সিনেমা দর্শকও জমাতে পারেনি।
* অফিসার : পুরোনো ধাঁচের পুলিশি থ্রিলার
ঈদের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘অফিসার’ সবচেয়ে পরিচিত ফর্মুলা অনুসরণ করেছে। সৎ পুলিশ কর্মকর্তা, অপরাধচক্র এবং ন্যায়বিচারের লড়াই-সবই আছে। কিন্তু ডি এ তায়েব ও মাহিয়া মাহী অভিনীত এ সিনেমায় দর্শকের জন্য মোটেও নতুন কিছু ছিল না। যা ছিল, সবই দর্শকের আগেই দেখা শেষ। ফলে, ঈদের সিনেমার তালিকায় এটির স্থান একেবারে তলানিতে। এটিরও নির্মাতা বদিউল আলম খোকন।
ফলাফল যা-ই হোক, এবারের ঈদের সিনেমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বৈচিত্র্য। একই ঈদে ‘রকস্টার’-এর মতো বিগ বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমা যেমন ছিল, তেমনি ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’-এর মতো শিল্পধর্মী সিনেমাও ছিল। বক্স অফিসের দৌড়ে হয়তো ‘রকস্টার’ এগিয়ে থাকবে, কিন্তু সিনেমাপ্রেমীদের আলোচনায় দীর্ঘদিন টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ‘রইদ’-এর। আর এটাই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সিনেমা এখন শুধু তারকার ওপর নয়, গল্পের শক্তির ওপরও ভর করতে শিখছে।
