দেশে কমছে স্টেজ শো
বাড়ছে শিল্পী মিউজিশিয়ানদের হতাশা
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুবছর আগেও স্টেজ শো নিয়ে দেশের সংগীতাঙ্গন ছিল জমজমাট। জনপ্রিয় শিল্পীদের শিডিউল থাকত টানা। নতুন গান প্রকাশের পাশাপাশি শিল্পীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের বড় জায়গা ছিল স্টেজ। সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। যদিও স্টেজ শো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে আগের তুলনায় আয়োজন কমেছে, অনেক ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে শো আয়োজন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নিরাপত্তা, অনুমতি, স্থানীয় পরিস্থিতি, আয়োজকদের ঝুঁকি এবং সামাজিক চাপ, সব মিলিয়ে সংকুচিত হচ্ছে লাইভ মিউজিকের বাজার। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শীর্ষ ব্যান্ড ও একক সংগীতশিল্পীদের ওপরও। শিল্পীদের ব্যস্ততার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল স্টেজ শো। তাদের অভিজ্ঞতাতেও এখন উঠে আসছে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনেও। একের পর এক কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন স্থগিত কিংবা বাতিল হতে থাকে। সেসময় অনেক শিল্পীর শিডিউল হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু শিল্পীরাই নন, তাদের সঙ্গে থাকা ব্যান্ডের মিউজিশিয়ান, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, লাইটিংকর্মী, মঞ্চকর্মী, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পেশার মানুষও ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে পরিস্থিতি এক জায়গায় আটকে থাকেনি। ২০২৫ সালে স্টেজ শো আবার কিছুটা গতি পেতে শুরু করে। বিভিন্ন উৎসব, করপোরেট অনুষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি আয়োজন ও কনসার্টে শিল্পীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই স্বস্তি আবারও প্রশ্নের মুখে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত স্টেজ শো করে আসা অ্যাসেজ ব্যান্ডকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের একটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনা চলতি বছর নতুন করে সামনে এনেছে দেশের কনসার্ট আয়োজনের নিরাপত্তা ও পরিবেশের প্রশ্ন। শুধু অ্যাশেজের একটি অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া নয়, ঘটনাটি ঢাকার বাইরে স্টেজ শো আয়োজন নিয়ে শিল্পী, আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকেও সামনে এনেছে। চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্ট আয়োজন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কোথাও অনুষ্ঠান স্থগিত হয়েছে, কোথাও নিরাপত্তাজনিত কারণে আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে আয়োজকরাও আগের মতো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
কিশোরগঞ্জের ওই ঘটনার অভিজ্ঞতা এবং দেশের সামগ্রিক স্টেজ শোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অ্যাশেজ ব্যান্ডের দলনেতা ও ভোকাল জুনায়েদ ইভানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক বিকাশ শুধু গান, কবিতা, উপন্যাস, সিনেমা নয়। সাংস্কৃতিক বিকাশের মধ্যদিয়ে একটা দেশের মানুষের তরুণ প্রজন্মের মন চিন্তা চেতনারও বিকাশ ঘটে। ভিন্নমত পোষণ করার যে স্বাধীনতা এটা যে প্র্যাক্টিস এটা সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম একটা অংশ। আমরা সারা দেশে কনসার্ট করতে চাই। যেহেতু আমরা গানের মানুষ। আমরা কনসার্ট নিয়েই কথা বলি। এবং কখনো কোনো এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যদি আমাদের সামনে আসে আমরা এটা প্রতিবাদ জানাই। আমরা সবসময় কনসার্ট করতে চাই এবং সার্বিকভাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা চাই।’
বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে আসিফ আকবর একটি আলাদা অধ্যায়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য স্টেজ শো করেছেন তিনি। তার গান যেমন অডিও বাজারে জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি সরাসরি মঞ্চেও পেয়েছেন বিপুল শ্রোতা। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার অভিজ্ঞতা তাই গুরুত্বপূর্ণ। আগের তুলনায় স্টেজ শো কমেছে কি না এবং এর পেছনে তিনি কী কী কারণ দেখছেন? জানতে চাইল এ সংগীতশিল্পী বলেন, ‘বাংলাদেশে তো এখন বলতে গেলে কনসার্টই বন্ধ। বিশেষ করে আউটডোর কনসার্ট। অর্থনৈতিক কারণে ইনডোর কনসার্টও একেবারেই কম। নতুন সরকার আসার পরে আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো সারা দেশে একটা স্টেজ শোয়ের জোয়ার থাকবে। আমরা যারা পেশাদার মিউজিশিয়ান আছি, অনেক দিন যাবতই খুব উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, কনসার্ট হলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সব ধরনের অপরাধ চলে, কিন্তু গান-বাজনাকে অপরাধ হিসাবে একটা শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেটা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ বেকার সময় কাটাচ্ছি এখন। আমাদের শিল্পীদের কোনো কাজ নেই। মিউজিশিয়ানদের কোনো কাজ নেই। অতীতে আমাদের অনেক শিল্পী-মিউজিশিয়ান দেশের বাইরে চলে গেছে। এখন শতভাগ মিউজিশিয়ান তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে দেশের বাইরে ট্রান্সফার হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে, যেটা দেশের জন্য অশনি সংকেত।’
স্টেজনির্ভর শিল্পীদের মধ্যে কাজী শুভ অন্যতম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নানা আয়োজনে নিয়মিত পারফর্ম করে আসছেন তিনি। বিশেষ করে জেলা শহর ও আঞ্চলিক পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলোতে তার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই আয়োজনের ধারাবাহিকতা কতটা আছে? কাজী শুভ বলেন, ‘আমরা সবাই মোটামুটি বুঝতেছি, পরিস্থিতি যে স্টেজ শো হচ্ছে না আসলে। খুবই কম, না হওয়ার মতোই। ওপেন স্টেজ শো একেবারেই কমে গেছে। আমরা আসলে সবাই চাই ভালো কিছু হোক। আমরা যারা স্টেজ শো করি, শুধু গায়ক-গায়িকা না, এদের সঙ্গে আরও হ্যান্ডস আছে। যন্ত্রসংগীতশিল্পী যারা বাদ্যযন্ত্র বাজায়, সাউন্ডের লোকজন আছে। অনেকেরই এখানে উপার্জনের একমাত্র মাধ্যমই এটা। সবাই আসলে কেউই হয়তো ভালো নেই। ভালো থাকারও কথা নয়। তবে আমরা আশা রাখি সবসময়। সব সময়ই চাই ভালো হোক, ভালো থাকুক সবাই। আমাদের সেক্টরে কাজটা বাড়ুক। স্টেজ শো বেশি হোক, তা আমরা সবাই চাই। জানি না সামনে কী হবে। সামনে শীতের সিজন আসছে, সেখানে কতটুকু কী হবে, তা তখনই বলা যাবে।’
বাংলাদেশে কনসার্টের পরিস্থিতি, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের স্টেজ শো নিয়ে লালন ব্যান্ডের দলনেতা, কম্পোজার ও ড্রামার থিন হান মং তিতির সঙ্গে কথা হয়। আগের তুলনায় কনসার্ট কমেছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি বলেন, এ বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তার মতে, গণমাধ্যমে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে, সেগুলো মূলত দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গত ২০-৩০, এমনকি ৪০ বছর ধরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তাই এগুলোকে তিনি আলাদাভাবে দেখছেন না। লালন ব্যান্ডের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিতি বলেন, তাদের ক্ষেত্রে কনসার্টের সংখ্যা কমে যায়নি। বরং আগের মতোই আছে। পটপরিবর্তনের পর কনসার্টের উদ্যোগ বরং বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে বিভিন্ন আয়োজনে বিশৃঙ্খলা, নিজেদের মধ্যে মারামারি, বোতল ছোড়াছুড়ি কিংবা ভেন্যুতে ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে স্টেজ শো কমার সবচেয়ে বড় প্রভাব অবশ্যই শিল্পীদের ওপর পড়ে। কিন্তু ক্ষতির পরিধি আরও বড়। একটি কনসার্টের সঙ্গে যুক্ত থাকেন গিটারিস্ট, ড্রামার, কিবোর্ডিস্ট, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, লাইটিং টেকনিশিয়ান, মঞ্চকর্মী, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহণকর্মীসহ অনেকে। একটি শো বাতিল হলে প্রত্যেকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অডিও ক্যাসেট ও সিডির যুগ শেষ হওয়ার পর শিল্পীদের আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্টেজ শো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করলেও বাংলাদেশের শিল্পীদের বড় একটি অংশ এখনো লাইভ পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্টেজ শো কমে যাওয়া মানে সংগীতশিল্পীদের জন্য আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা সংকুচিত হওয়া।
স্টেজ শোর বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ঢাকার বাইরের আয়োজনে। ঢাকায় বড় করপোরেট অনুষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আয়োজন কিংবা ছোটখাটো অনুষ্ঠান হচ্ছে। কিন্তু জেলা শহর বা উপজেলা পর্যায়ে বড় আয়োজন করতে গেলে আয়োজকদের নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কি না, প্রশাসনিক অনুমতি পাওয়া যাবে কি না, অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে কোনো বাধা তৈরি হবে কি না, এসব প্রশ্ন এখন আয়োজকদের মাথায় থাকছে। ফলে অনেকে অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ কারণে শিল্পী, মিউজিশিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তবে কেউ কেউ বিদেশে শো করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। যেমন, সময়ের জনপ্রিয় দুই সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা ও ইমরান মাহমুদুল এ মুহূর্তে আমেরিকায় স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কিন্তু এ ধরনের শিল্পীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। বাকিদের অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। শিল্পীদের মতে, স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্টেজ শো আবার আগের জায়গায় ফিরতে পারে। কারণ শিল্পী যেমন মঞ্চে উঠতে চান, শ্রোতারাও তাদের প্রিয় শিল্পীদের সরাসরি দেখতে চান। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন আয়োজকদের আস্থা, শিল্পীদের নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ-এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
