Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

যেভাবে বদলে গেছে গানের বাজার

Icon

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একসময় নতুন গান মানেই ছিল ক্যাসেটের ফিতা, অ্যালবামের দোকান আর রেডিও-টেলিভিশনের অপেক্ষা। এরপর এলো সিডি, মোবাইলের রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউন। এমপি থ্রি ও পাইরেসি সেই বাজারে বড় ধাক্কা দিলেও ইউটিউব নতুন দরজা খুলে দেয়। এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম রিলস, টিকটক ও শর্ট ভিডিওতে একটি গানের জনপ্রিয়তাই হয়ে উঠছে নতুন অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ফলে শুধু গান শোনার মাধ্যম নয়, বদলে গেছে গান তৈরি, প্রচার, আয় ও কপিরাইটের পুরো কাঠামো।

* ক্যাসেটের বাজার থেকে ডিজিটাল যাত্রা

নব্বইয়ের দশক থেকে দুই হাজারের শুরুর সময়-বাংলাদেশের গানের বাজারের সবচেয়ে দৃশ্যমান পণ্য ছিল অডিও ক্যাসেট। নতুন অ্যালবাম প্রকাশ মানে ছিল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, ক্যাসেট উৎপাদন, পরিবেশক, দোকান ও ক্রেতাকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক বৃত্ত। শিল্পী ও স্রষ্টাদের পাশাপাশি এই অর্থনীতিতে যুক্ত ছিলেন রেকর্ডিং স্টুডিও, প্রচ্ছদশিল্পী, পোস্টার নির্মাতা, পরিবহণকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ। দুই হাজার সালের শুরুতে সিডি এসে সেই বাজার দখলে নেয়। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন খুব বেশি সময় দেয়নি এ মাধ্যমকেও। এমপি থ্রি, ইন্টারনেট এবং অবৈধ ডাউনলোডে শ্রোতার হাতে একসঙ্গে শত শত গান পৌঁছে যায়। ফলে অ্যালবাম বিক্রি কমতে থাকে, বন্ধ হতে থাকে ক্যাসেট-সিডির দোকান। বাংলাদেশে এখন অডিও ক্যাসেট, সিডি, ভিসিডি বা ডিভিডির বাণিজ্যিক উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

* রিংটোনে তৈরি হয়েছিল নতুন বাজার

ফিজিক্যাল অ্যালবামের বাইরে মোবাইল ফোনের বিস্তার গানের জন্য আরেকটি অর্থনৈতিক পথ তৈরি করে-রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউন। একটি জনপ্রিয় গানের কয়েক সেকেন্ডের অংশও হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক পণ্য। গান ব্যবহারের অনুমতি, কপিরাইট ও রয়্যালটি নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। তবে এই বাজারও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তারে শ্রোতার গান শোনার অভ্যাস চলে যায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

* ইউটিউব বদলে দিল হিসাব

ইউটিউব বাংলাদেশের গানের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বাঁকগুলোর একটি। আগে গান বিক্রি করতে হতো; এখন গান প্রকাশ করে দর্শক-শ্রোতা তৈরি করতে হয়। ভিউ, বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রাইবার, কনটেন্ট আইডি এবং ব্র্যান্ড সহযোগিতা-সব মিলিয়ে ইউটিউব হয়ে ওঠে আয়ের নতুন ক্ষেত্র। বাংলাদেশের পাঁচটি বড় মিউজিক লেবেল নিয়ে করা একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিজিটাল যুগে ইউটিউবই এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়ের উৎস হিসাবে উঠে এসেছে। এ কারণে ফিজিক্যাল মিউজিক পণ্যের বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গান প্রকাশের ব্যবসায়ও এসেছে পরিবর্তন। আগে একটি অ্যালবাম বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ ছিল; এখন একটি গান কত ভিউ পেল, কত মানুষ শেয়ার করল, কত দিন ট্রেন্ডে থাকল-এসব হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক আলোচনার অংশ। এছাড়া দেশের প্রায় প্রত্যেক শিল্পীই এখন বড় কোনো লেবেলের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেরাই ইউটিউবে চ্যানেল খুলে গান আপলোড করছেন। কাউকে ভাগ না দিয়ে নিজেরাই এককভাবে লাভবান হচ্ছেন।

* স্ট্রিমিংয়ে গান হলো ‘চলমান সম্পদ’

ইউটিউবের পাশাপাশি স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার গানের আয়ের ধারণাকে আরও বদলে দিয়েছে। এ সময়ে এসে গান আর একবার বিক্রি হওয়া কোনো পণ্য নয়; বরং বারবার শোনা হলে তার সঙ্গে যুক্ত অধিকার ও লাইসেন্স থেকে আয় তৈরি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সংগীত পরিচালক ফুয়াদ আল মুক্তাদির বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘গান এখন আর স্টুডিওর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। বৈশ্বিক রয়্যালটি সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে; এমনকি মিউজিক প্রডিউসাররা বিট ও স্যাম্পল লাইব্রেরি থেকেও আয় করছেন।’

তবে ‘স্ট্রিম’ মানেই শিল্পীর হাতে সরাসরি টাকা পৌঁছানো নয়। কোন অধিকার কার, চুক্তি কেমন, লেবেল বা পরিবেশকের সঙ্গে আয় ভাগাভাগির নিয়ম কী-এসবের ওপর অর্থের বণ্টন নির্ভর করে।

* রিলস-শর্টসে বদলে গেল হিট হওয়ার সংজ্ঞা

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে। একটি গানের পুরো তিন-চার মিনিটের জনপ্রিয়তার চেয়ে এখন ১৫ বা ৩০ সেকেন্ডের একটি অংশ ভাইরাল হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের রিলসে কোনো গানের একটি লাইন বা সুর ব্যবহার করে হাজার হাজার ভিডিও তৈরি হতে পারে। সেই ব্যবহার আবার মূল গানটির ইউটিউব ও স্ট্রিমিং শ্রোতা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ গান এখন শুধু ‘শোনার পণ্য’ নয়; এটি একইসঙ্গে ভিডিও তৈরির উপাদান। দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরাও রিলস ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহারের মাধ্যমে আয়ের গুরুত্বের কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষ অডিও ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশন (ডিএসএস)-এর কর্ণধার সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘রিলস ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে গানের ব্যবহার এখন শিল্পীদের জন্য নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছে। একটি গান অসংখ্য ভিডিওতে ব্যবহৃত হলে বাড়ে শ্রোতা ও স্ট্রিমিং, আর বৈধ লাইসেন্স ও রয়্যালটির মাধ্যমে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও স্বত্বাধিকারীরা সেই ব্যবহারের বিপরীতে অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সম্ভাবনা।’

এর ফলে গান তৈরির পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এসেছে। কোন অংশটি সহজে উদ্ধৃত করা যায়, কোন লাইনটি ভিডিওতে ব্যবহারযোগ্য, কোন সুরে নাচ বা অভিনয় করা যায়-এসবও এখন বিপণনের বিবেচনায় আসছে।

* জনপ্রিয়তা বাড়ছে, কিন্তু রয়্যালটি কতটা পৌঁছাচ্ছে?

ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। বাংলাদেশের কপিরাইট আইন, ২০২৩-এ সংগীত ও শব্দ-ধ্বনি রেকর্ডিংয়ের কপিরাইট স্বীকৃত; একই আইনে স্ট্রিমিং, সাবস্ক্রিপশন ও ডাউনলোডসহ বিভিন্ন ব্যবহারের ক্ষেত্রে রয়্যালটি আদায়ের বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা আর বাস্তবে প্রত্যেক স্রষ্টার কাছে যথাযথ অর্থ পৌঁছানো এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের আয়োজিত ‘সংগীতে মেধাস্বত্বাধিকার : স্ট্রিমিং ও রয়্যালিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রয়্যালটি সংগ্রহের জটিলতার কথা উঠে এসেছিল।

সংগীতশিল্পী কাজী শুভর মতে, একটি গান ইউটিউব, ফেসবুক, শর্টস, রিলস ও বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হলেও প্রতিটি ব্যবহারের বিপরীতে কার কত পাওনা এবং সেই অর্থ কীভাবে স্রষ্টার কাছে পৌঁছাবে-এ ব্যবস্থাটি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

* সামনে অর্থনীতি হবে ‘গানের’ চেয়ে ‘গানের অধিকার’-এর

ক্যাসেটের যুগে ব্যবসার কেন্দ্র ছিল একটি অ্যালবাম বিক্রি। সিডির যুগে সেটি হলো কপি বিক্রি। ইউটিউবে গুরুত্ব পেল ভিউ ও বিজ্ঞাপন। স্ট্রিমিংয়ে গুরুত্ব পেল শ্রোতার ব্যবহার। আর শর্ট ভিডিওর যুগে একটি গানের কয়েক সেকেন্ডও হয়ে উঠছে মূল্যবান সম্পদ। তাই বাংলাদেশের গানের অর্থনীতির বিবর্তন আসলে মাধ্যম বদলের গল্পের পাশাপাশি অধিকার ও আয়ের মালিকানা বদলের গল্পও বটে। ভবিষ্যতে কে গান গাইলেন-তার পাশাপাশি গানটির স্বত্ব কার, কোথায় ব্যবহার হলো, কতবার ব্যবহার হলো এবং সেই ব্যবহারের অর্থ কার কাছে গেল-এসব প্রশ্নই হয়তো সংগীত ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তাই বলা যায়, আসলে গান বদলায়নি; বদলে গেছে গানকে ঘিরে অর্থ উপার্জনের পদ্ধতি।

‘গান এখন আর স্টুডিওর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। বৈশ্বিক রয়্যালটি সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে; এমনকি মিউজিক প্রডিউসাররা বিট ও স্যাম্পল লাইব্রেরি থেকেও আয় করছেন।’

- ফুয়াদ আল মুক্তাদির, সংগীত পরিচালক

‘একটি গান অসংখ্য ভিডিওতে ব্যবহৃত হলে বাড়ে শ্রোতা ও স্ট্রিমিং, আর বৈধ লাইসেন্স ও রয়্যালটির মাধ্যমে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও স্বত্বাধিকারীরা সেই ব্যবহারের বিপরীতে অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সম্ভাবনা।’

- ধ্রুব গুহ, সংগীতশিল্পী ও কর্ণধার ডিএসএস

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

যেভাবে বদলে গেছে গানের বাজার

যেভাবে বদলে গেছে গানের বাজার

নতুন ধারাবাহিকে সামিরা খান মাহি

নতুন ধারাবাহিকে সামিরা খান মাহি

দুই নাটকের কাজ শেষ করলেন নীহা

দুই নাটকের কাজ শেষ করলেন নীহা

আবারও প্রেক্ষাগৃহে ‘স্পাইডার-ম্যান’

আবারও প্রেক্ষাগৃহে ‘স্পাইডার-ম্যান’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম