Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

বক্স অফিস-এর অভাব

ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় অস্বচ্ছতা

একটি সিনেমা মুক্তির পর প্রথম প্রশ্ন ওঠে-কত টাকা আয় করল? কিন্তু ঢাকাই সিনেমায় এই সহজ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোথাও প্রযোজকের দেওয়া হিসাব, কোথাও প্রেক্ষাগৃহ মালিকের দাবি, আবার কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা অঙ্ক। দর্শক কত টিকিট কিনেছেন, কোন প্রেক্ষাগৃহে কত বিক্রি হয়েছে, মোট আয় কত-এসব তথ্যের কোনো একক, যাচাইযোগ্য ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য উৎস নেই। ফলে সিনেমার সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব যেমন অস্পষ্ট থেকে যায়, তেমনি প্রশ্ন ওঠে পুরো বাণিজ্যিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Advertisement

Icon

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি সিনেমা কত টাকা আয় করল-এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য যে বিষয়টির ওপর সংশ্লিষ্ট সবাই নির্ভরশীল, তা হলো ‘বক্স অফিস’। বক্স অফিস হলো সিনেমা প্রদর্শনের পর টিকিট বিক্রি থেকে অর্জিত মোট আয়ের হিসাব। এর মাধ্যমে একটি সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্য, দর্শকসংখ্যা ও বাজারচিত্র পরিমাপ করা হয়। হলিউড, বলিউডসহ বিশ্বের প্রায় সব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই বক্স অফিসের ব্যবহার আছে। কিন্তু ঢালিউড তথা বাংলাদেশের কোনো সিনেমার প্রকৃত আয় জানার জন্য এখনো এমন কোনো কেন্দ্রীয় ও নির্ভরযোগ্য বক্স অফিস ব্যবস্থা নেই, যেখানে প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহের টিকিট বিক্রির তথ্য নিয়মিতভাবে জমা হবে এবং সেখান থেকে সিনেমার মোট আয়ের হিসাব পাওয়া যাবে। ফলে মুক্তির পর কোনো সিনেমার ব্যবসা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয় অনুমান, প্রচারণা ও পরস্পরবিরোধী দাবি।

সাধারণত একটি সিনেমার টিকিট বিক্রির হিসাব প্রেক্ষাগৃহের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, পরিবেশক ও প্রযোজকের মধ্যে ঘুরপাক খায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিজিটাল টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম থেকে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলেও দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ একই ব্যবস্থার আওতায় নেই। ফলে একটি সিনেমা দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে কত টিকিট বিক্রি করেছে, মোট কত দর্শক সেটি দেখেছেন কিংবা মোট বক্স অফিস আয় কত-এক জায়গায় বসে সেই তথ্য যাচাই করার সুযোগ থাকে না।

এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়। প্রযোজক ও প্রেক্ষাগৃহ মালিকের হিসাব একই কি না, সেটি যাচাই করার মতো কেন্দ্রীয় ডেটাবেস না থাকলে বিতর্কের সুযোগ থেকেই যায়। একটি সিনেমার আয় নিয়ে প্রযোজক এক ধরনের অঙ্ক প্রকাশ করলেন, অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহের হিসাবের সঙ্গে সেটি মিলল না-এমন পরিস্থিতিতে সত্যতা যাচাইয়ের নিরপেক্ষ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার অনেক সময় ‘হাউসফুল’, ‘রেকর্ড ব্যবসা’ কিংবা ‘বাম্পার কালেকশন’-এর মতো প্রচারণামূলক শব্দ ব্যবহার করা হলেও তার পেছনে সুনির্দিষ্ট টিকিট বিক্রির পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না।

শুধু আয়ের হিসাব নয়, দর্শকসংখ্যার ক্ষেত্রেও একই সংকট। একটি সিনেমা কত মানুষ দেখেছেন, কোন শহরে দর্শক বেশি ছিল, কোন প্রেক্ষাগৃহে কত আসন বিক্রি হয়েছে-এসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ না হলে সিনেমার বাজারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। অথচ এই তথ্য শুধু একটি সিনেমার ব্যবসা বোঝার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রযোজনা পরিকল্পনা, প্রেক্ষাগৃহ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশনা কৌশল এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

টিকিট বিক্রির তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কাগজের টিকিট, প্রেক্ষাগৃহের নিজস্ব সফটওয়্যার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা হাতে রাখা হিসাব-ব্যবস্থা একেক জায়গায় একেক রকম হলে তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা কঠিন। একইসঙ্গে টিকিটের মূল্য, শো সংখ্যা, আসনসংখ্যা, ছাড় বা বিশেষ প্রদর্শনীর তথ্যও হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে শুধু মোট টাকার অঙ্ক প্রকাশ করলেই পুরো বাণিজ্যিক চিত্র স্পষ্ট হয় না; দরকার যাচাইযোগ্য ও মানসম্মত ডেটা।

বক্স অফিসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তরুণ পরিচালক অনন্য মামুন বলেন, ‘বক্স অফিস হলো সিনেমা ব্যবসার প্রাণ। আর ই-টিকিটিং হলো তার হার্ট। কোথায় কত দর্শক, কত টিকিট বিক্রি এবং প্রকৃত ব্যবসা কত-এসবের সঠিক হিসাব ই-টিকিটিং ছাড়া জানা সম্ভব নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, গৌরবময় ৫০ বছর পার করেও আমাদের সিনেমাশিল্পে এখনো কার্যকর ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। ই-টিকিটিং মানেই ব্যবসায় স্বচ্ছতা। আর স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো শিল্পই দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি করতে পারে না।’

আশার কথা হলো, চলতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সার্ভারের আওতায় ই-টিকিটিং ও কেন্দ্রীয় বক্স অফিস চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোর টিকিট বিক্রির তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিটি শোর আসনসংখ্যা, বিক্রীত টিকিট, টিকিটের মূল্য এবং মোট বিক্রির তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা গেলে সিনেমার ব্যবসা পরিমাপের বর্তমান অস্পষ্টতা কমানো সম্ভব।

তবে শুধু ই-টিকিটিং চালু করলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে-এমন নয়। দেশের সব প্রেক্ষাগৃহকে একই প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় আনা, ইন্টারনেট ও সফটওয়্যার সুবিধা নিশ্চিত করা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ডেটার মালিকানা ও ব্যবহারের নিয়মও স্পষ্ট করা জরুরি। কোন তথ্য সরকার সংরক্ষণ করবে, কোন তথ্য প্রযোজক ও পরিবেশক দেখতে পারবেন এবং দর্শকের জন্য কোন তথ্য প্রকাশ করা হবে-এসব বিষয়ে পরিষ্কার নীতিমালা প্রয়োজন।

কেন্দ্রীয় বক্স অফিস চালু হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে ‘দাবি’ থেকে ‘ডেটা’র দিকে যাত্রা। একটি সিনেমা কত আয় করেছে-এমন প্রশ্নের উত্তর তখন নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট প্রেক্ষাগৃহের বিক্রির তথ্য থেকে বের করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রেক্ষাগৃহ মালিকের মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগির হিসাবেও স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরাও বুঝতে পারবেন কোন ধরনের সিনেমার দর্শক কত, কোন অঞ্চলে কোন ধরনের সিনেমার চাহিদা বেশি।

তবে কেন্দ্রীয় বক্স অফিসের সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তব প্রয়োগের ওপর। শুধু একটি সার্ভার তৈরি করে সেখানে তথ্য পাঠানোর নিয়ম করলেই হবে না; দেশের প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে সেই তথ্য নিয়মিত ও সঠিকভাবে প্রবেশ করছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তথ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিত প্রকাশ করা হলে দর্শক, সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও সিনেমাসংশ্লিষ্টরা একই তথ্যের ভিত্তিতে বাজার বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

ঢাকাই সিনেমার বক্স অফিসে তাই মূল সংকট শুধু কত টাকা আয় হয়েছে, সে সংখ্যাটি জানা নয়; বরং সে সংখ্যার উৎস কোথায়-সেটি জানা। একটি শিল্প যখন বড় বিনিয়োগ, তারকা, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও দর্শকের অর্থের সঙ্গে যুক্ত, তখন তার ব্যবসায়িক তথ্যও হওয়া প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য। কেন্দ্রীয় ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাটির মূল্যায়ন হবে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তরে-একটি সিনেমা কত টাকা আয় করেছে জানতে আর কি কারও দাবি বিশ্বাস করতে হবে, নাকি একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেস খুললেই উত্তর পাওয়া যাবে?

‘বক্স অফিস হলো সিনেমা ব্যবসার প্রাণ। আর ই-টিকিটিং হলো তার হার্ট। কোথায় কত দর্শক, কত টিকিট বিক্রি এবং প্রকৃত ব্যবসা কত-এসবের সঠিক হিসাব ই-টিকিটিং ছাড়া জানা সম্ভব নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, গৌরবময় ৫০ বছর পার করেও আমাদের সিনেমাশিল্পে এখনো কার্যকর ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। ই-টিকিটিং মানেই ব্যবসায় স্বচ্ছতা। আর স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো শিল্পই দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি করতে পারে না।’

- অনন্য মামুন, পরিচালক ও প্রযোজক

বছর দুয়েক আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রিয়তমা’ নামে একটি সিনেমার দৃশ্য এটি। অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও ইধিকা পাল। প্রযোজকের দাবি, সিনেমাটি ৪০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যবসা করেছে। কিন্তু এর স্বপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাননি বা দেখাতে পারেননি। বক্স অফিস না থাকার কারণে প্রযোজকের দেওয়া এ তথ্য শুধু ফাঁকা আওয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বক্স অফিস-এর অভাব ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় অস্বচ্ছতা

ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় অস্বচ্ছতা

যুক্তরাজ্যে প্রবাসীদের গান শোনাবেন সাবিনা ইয়াসমিন ও ফেরদৌস ওয়াহিদ

যুক্তরাজ্যে প্রবাসীদের গান শোনাবেন সাবিনা ইয়াসমিন ও ফেরদৌস ওয়াহিদ

কানাডায় নাচবেন শিবলী ও নীপা

কানাডায় নাচবেন শিবলী ও নীপা

জোলির হাতের লেখা নিয়ে নেটদুনিয়ায় হইচই

জোলির হাতের লেখা নিয়ে নেটদুনিয়ায় হইচই

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম