হ্যালো...
ডাক্তার বলেছে আরমাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচব
তানিয়া বৃষ্টি-নাটকের বর্তমান প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম। সাবলীল অভিনয়, অভিব্যক্তির গভীরতা আর পর্দায় নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে মেলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে দর্শকদের কাছে করে তুলেছে অনন্য। কখনো চোখের ভাষা গল্প বলা, কখনো তার হাসি কিংবা নীরবতাই হয়ে ওঠে অভিনয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ। গ্ল্যামারের বাইরেও অভিনয়ের প্রতি তার আন্তরিকতা ও চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার চেষ্টা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। প্রতিটি কাজে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার থাকে তার দারুণ প্রচেষ্টা। সেই তানিয়া আরমাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচবেন-এমনটাই বলেছেন চিকিৎসক! এরইমধ্যে ঢাকা ও চেন্নাইয়ে দুটি জটিল অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি আর কেমোথেরাপির দীর্ঘ পথ দিয়েছেন। মস্তিষ্কের টিউমার ধরা পড়ার পর টানা ১০ মাস অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন এ জনপ্রিয় অভিনেত্রী। চিকিৎসা এখনো চলছে, বাকি আছে আরও দুই মাসের কেমোথেরাপি। তবু মনের জোরে সম্প্রতি একটি নাটকের শুটিংয়ের মাধ্যমে আবারও কাজে ফিরেছেন তিনি। ফেরার অনুভূতি, কঠিন দিনগুলো আর সামনের পথচলা নিয়ে আজকের ‘হ্যালো...’ বিভাগে কথা বলেছেন তিনি।
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
* এখন শরীর ও মনের অবস্থা কেমন?
** পরম করুনাময় আল্লাহর রহমতে এখন সত্যিই মনে হয়, আমি সুস্থ হতে চলেছি। ১০ মাস পর এখন ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া, ব্যায়াম, আড্ডা, হাসাহাসি করতে পারছি। খুশি হলে লাফালাফিও করি। শুরুতে মাথার ডানদিকের অস্ত্রোপচারের কারণে বাঁ দিকে শুতে পারতাম না, খুব দুর্বল লাগত, মাথা ঘুরত, বমি হতো। রেডিওথেরাপির সেই কঠিন সময় পেরিয়ে জীবন এখন স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে।
* চিকিৎসা চলাকালীন শুটিং করলেন। এতদিন পর ক্যামেরার সামনে ফিরে কেমন লাগল?
** গত ১০ মাস কোনো কাজ করতে পারিনি। শুটিং স্পট আমার পরিবার, শান্তির জায়গা। এটা ভীষণ মিস করেছি। আবার কাজ শুরু করে মনে হলো, যেখানে থাকতে চেয়েছিলাম সেখানেই ফিরে এসেছি। যেন নতুন করে জন্ম নিলাম।
* সেটে প্রথম দিনটি কেমন কেটেছিল?
** প্রথমদিন থেকেই পুরো টিম ভীষণ আন্তরিক ছিল। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সংলাপ বলা, শট দেওয়া, সবসময় ক্যামেরাম্যান, পরিচালক ও প্রোডাকশনের সবাই খেয়াল রাখছিলেন আমি ঠিক আছি কি না। পরিবার যেভাবে পাশে থাকে, তারাও সেভাবেই আমাকে আগলে রেখেছেন।
* অংশীদার’র গল্প কী নিয়ে? এ কাজ দিয়েই ফিরলেন কেন?
** নাটকটি পরিচালনা করেছেন ইকসান রনি। পারিবারিক সম্পত্তি ও লেনদেনের বাস্তব গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে এটি। আমার চরিত্রের নাম সুমি। বাবার মৃত্যুর পর চাচার সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আশপাশের সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পে কাজ করতে আমি পছন্দ করি, তাই এ গল্পটি বেছে নিয়েছি।
* চিকিৎসকরা এখন কী বলছেন?
** আমার ডাক্তার প্রথমে শুটিং করার অনুমতি দিতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, সার্জারি ও রেডিওথেরাপির পর কেমো চলার সময় শুটিং করলে শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু শুটিং আমার শান্তির জায়গা, না করতে পেরে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম। অনেক অনুরোধ করে এই একটা কাজ করেছি। আমার আরও দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি। এরপর মাথায় আবার এমআরআই ও সিটি স্ক্যান করে টিউমারের বর্তমান অবস্থা দেখা হবে।
* সামনে আর কোনো কাজের পরিকল্পনা আছে?
** এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা করিনি। ১০ মাস পর এ কাজটি ছিল নিজেকে পরখ করার চ্যালেঞ্জ, রোদ, সংলাপ আর মাথার চাপ নিতে পারি কি না। আল্লাহর রহমতে সফল হয়েছি। এখন পরিস্থিতি বুঝে কাজ গুছিয়ে সবাইকে জানাব।
* মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ার খবর প্রথম শুনে তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল?
** গত ডিসেম্বরে শুটিংয়ের সময়ই বারবার মাথাব্যথা হচ্ছিল। টানা চার দিন ব্যথা নিয়ে কাজ করার পর পঞ্চম দিনে বমি হলে হাসপাতালে ভর্তি হই। পরদিন সন্ধ্যায় রিপোর্টে টিউমার ধরা পড়ে। তখন ভেবেছিলাম, অপারেশন হলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরে চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালে একজন অনকোলজিস্ট যখন বললেন আমি আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর বাঁচব, তখন জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা খাই। তখন প্রচণ্ড কেঁদেছি।
* চিকিৎসা চলাকালীন সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটি ছিল?
** ঢাকায় প্রথম অপারেশনের আগে মাকে ধরে কেঁদেছি, সহকর্মীদের বলেছি ‘ভালো থাইকো’। আড়াই ঘণ্টার সেই অপারেশনের পর অবশ্য স্বাভাবিকই ছিলাম। মানসিকভাবে প্রথম কঠিন সময় ছিল চেন্নাইয়ে, যখন ডাক্তার বেঁচে থাকার সময়সীমা বেঁধে দিলেন আর ভাবলাম, মাকে আর পাব না। এরপর দ্বিতীয় সার্জারির সময় শরীর এত খারাপ হয়ে যায় যে লাইফ সাপোর্টে যেতে হয়। তখন আমার নিজের কোনো অনুভূতি ছিল না। কিন্তু সারারাত মায়ের কান্না আর নামাজে আকুতির কথা পরে শুনেছি, পরিবারের জন্য সেটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত।
* লাইফ সাপোর্ট থেকে জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কী মনে পড়েছিল?
** লাইফ সাপোর্ট খোলার পর দুপুরে আইসিইউতে চোখ খুলে দেখি চারদিকে রক্ত, শরীরে পাইপ। প্রথম চিন্তাই ছিল, মা আর বোন কোথায়। আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে নেওয়ার পর অক্সিজেন মাস্কে অস্বস্তি হচ্ছিল, তাই মাস্ক খোলার জন্য ঝগড়া করেছি। একটু স্বাভাবিক হতেই একের পর এক খাবার খেতে চেয়েছি।
* আপনাকে নিয়ে তখন মৃত্যুর গুজবও রটেছিল...
** মৃত্যুর গুজব প্রথমে দেখে খারাপ লেগেছিল। পরে বুঝেছি, কিছু মানুষ শুধু ভিউয়ের জন্য এসব করে। এখন আর এসব মিথ্যা খবর মাথায় নেই না।
* ওই সময়ে কারা পাশে ছিলেন?
** পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি পাশে ছিল। মোশাররফ করিম, নিলয়, প্রযোজক আলী বশীর, তুহিন ভাই, রাফাত ভাইসহ সহকর্মী ও পরিচালকরা নিয়মিত ফোন-মেসেজে খোঁজ নিয়েছেন। তবে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার মা ও বোন। বাবা নেই, তাই মা সারা রাত আমার মাথার পাশে জেগে বসে থাকতেন। চিন্তায় চিন্তায় তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মা ও বোনই আমাকে ধরে রেখেছেন।
* অসুস্থতা কি আপনার জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে?
** আমার জীবনদর্শন পুরোই বদলে গেছে। ২০১২ সালে কিছু না বুঝে শুধু প্যাশন থেকে অভিনয় শুরু করেছিলাম। এখন আবার সেই একই স্বপ্ন, ইচ্ছা আর উদ্দীপনা নিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করছি। আর দর্শকের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। যেখানেই যাই, মানুষ এসে বলেন তারা আমার সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন।
* ক্যারিয়ারে এক যুগেরও বেশি পথচলায় সেরা প্রাপ্তি কী?
** কাজের দিক থেকে অর্জনের এখনো অনেক বাকি বলে মনে করি। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার দর্শক ও ভক্তদের ভালোবাসা, যারা মন থেকে আমার ভালো চান। আমার মা এবং বোনও আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি।
* ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা মানুষদের জন্য আপনার বার্তা কী?
** ক্যানসারের কথা শুনলে মানুষ ভয় পায়। কিন্তু মনের জোর আর বিশ্বাস রাখতে হবে, ‘আমি সুস্থ হব’। জ্বর যেমন ভালো হয়, ক্যানসারও তেমনি ভালো হবে, এই চিন্তায় মন শক্ত রাখতে হবে। আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। চিকিৎসকের নিয়ম মানা, পরিচ্ছন্ন থাকা, সঠিক খাবার খাওয়া এবং পরিবার নিয়ে হাসিখুশি ও ইতিবাচক থাকাই আমার মতে মূল চাবিকাঠি।
