এক মাসে ৫৫২ কোটি টাকা ঘুস দাবির তথ্য
Advertisement
অমিত রায়, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা উত্তোলন ও পাসপোর্ট করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি এবং ঘুস চাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি ময়মনসিংহের কিশোর শাহেদ শরিফ আহমেদের ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে সংশ্লিষ্ট জেলা তথা সারা দেশে। এ ‘ঘুষ.সাইট’-এ গত এক মাসে জমা পড়া ১৯ হাজার রিপোর্ট থেকে প্রায় ৫৫২ কোটি টাকার ঘুসের অভিযোগ উঠেছে। এসব রিপোর্টের মধ্যে ভূমি অফিস ও পাসপোর্ট অফিস ঘুসের সূচকে শীর্ষে রয়েছে। ঘুষ.সাইট-এর তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় প্রতিনিয়ত হুমকি পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে নিজ উদ্যোগে পরিচালিত এ সাইটটি নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তারা। উল্লেখ্য, ‘ঘুষ.সাইট’-এ জমা পড়া অভিযোগকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে দাবি করছেন না উদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, ওয়েবসাইটটি কোনো তদন্ত সংস্থা নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্পও নয়। সাইটে প্রকাশিত অভিযোগগুলোকে ‘আনভেরিফায়েড’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উদ্যোক্তারা জানান, উদ্যোগটি চালু থাকলে ঘুস-দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখবে। তবে তা অনেকাংশে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে। ফলে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন তারা।
যে কারণে তৈরি হয় ‘ঘুষ.সাইট’ : ময়মনসিংহ নগরীর সানকিপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহেদ শরীফ আহমেদ। ১৮ বছর বয়সি শাহেদ ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালে এ-লেভেলে পড়াশোনার পাশাপাশি শিখছেন ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শাহেদের মা আমিনা খাতুন অসুস্থতাজনিত কারণে ২০২২ সালে ডিসেম্বরে মৃত্যুর পর তার পেনশন ও অন্যান্য ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে সরকারি দপ্তরের পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হন। পাশাপাশি ঘুস দিতে হয়। এছাড়া বছর দেড়েক আগে নিজের পাসপোর্ট করাতে গিয়েও ঘুস দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয় তার। সেই থেকেই ভারতের একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগী হন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাইফ কবীরের সহযোগিতায় চলতি বছরের ২১ আগস্ট চালু করেন সাইটটি। শাহেদ জানান, ‘মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে যাই। তখন আমাদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দুই লাখ টাকা ঘুস দাবি করেছিলেন। আমার বাবা ঘুস দিতে রাজি না হওয়ায় সে টাকা তুলতে পারিনি আমরা। এছাড়া নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও দুই হাজার টাকা ঘুস দিতে হয় তাকে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বন্ধু সাইফ কবীরের সহযোগিতায় ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির উদ্যোগ নেই।’ শাহেদ শরীফ আহমেদ জানান, দেশের প্রতিটি অফিসে কাজ করতে গেলে ঘুস ছাড়া কিছুই হয় না-এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ ঘুস-দুর্নীতির চিত্রটি সামনে আনতেই আমরা উদ্যোগটি নিয়েছি। চালুর প্রথম ১০ দিনে ১০ হাজারের বেশি রিপোর্টে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ঘুস হিসাবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ৩৩০ কোটি টাকার বেশি এবং রোববার পর্যন্ত ৩০ দিনে ঘুস চাওয়া অর্থের পরিমাণ ৫৫২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সাইফ কবীর জানান, সময় যত যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত অভিযোগ বাড়ছে। যেভাবে কাজ করে ‘ঘুষ.সাইট’-ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুস হিসাবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল-এ ধরনের তথ্য দিতে হয়। অভিযোগ দিতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। সাইটটিতে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি। উদ্যোক্তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। সরকারি দপ্তরের সেবা পেতে ঘুসের চিত্র তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য। অভিযোগ বা রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর তা সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা নীতিমালা লঙ্ঘন করে-এমন অভিযোগ বাদ দেওয়া হয়। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ‘ঘুষ.সাইট’ এখন পর্যন্ত নিজেদের অর্থেই পরিচালিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি কোনো এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। তবে ঘুষ.সাইট-এর জন্য স্বেচ্ছায় অনুদানের সুযোগ রয়েছে।
