পাহাড় কেটে রিসোর্ট
কমলগঞ্জে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য * কতটি কার্যক্রম চলছে জানে না প্রশাসন
Advertisement
আব্দুর রাজ্জাক রাজা, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কমলগঞ্জে সবুজে ঘেরা চা-বাগান, পাহাড়, টিলা আর ঘন বনাঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে গড়ে উঠেছে পর্যটন এলাকা। তবে পর্যটন উন্নয়নের আড়ালে জেলাজুড়ে চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। পাহাড় ও টিলা কেটে নামে-বেনামে গজিয়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ রিসোর্ট। বন বিভাগের জমি দখল করে কোনো প্রকার আইনের তোয়াক্কা না করেই পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ বানিয়েই নাম দেওয়া হচ্ছে ‘রিসোর্ট’। এদের কোনো বৈধতা বা সরকারি অনুমতি আছে কিনা তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই প্রশাসনের কোনো দপ্তরে। ফলে কমলগঞ্জ উপজেলার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হয়েছে অর্ধশতাধিক অবৈধ রিসোর্ট-কটেজ। সরকারি খাস ও বন বিভাগের জমি দখল করে পাহাড় এবং টিলা কেটে এ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের টিলাগাঁও এলাকায় টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ ও আম্বার উড ইকো রিসোর্ট, পুরানবাড়ি এলাকায় বেকইয়ার্ড রিট্রেট, কারাঞ্জা স্পা রিসোর্ট, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছাতকছড়া এলাকায় সাউন্ড অব সাইলেন্স, স্বপ্নটিলা ইকো রিসোর্ট, বনগাঁও এলাকায় অরণ্য নিবাসসহ অর্ধশতাধিক রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এসব রিসোর্টের মধ্যে কয়েকটির কাজ এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়া শমশেরনগর এয়ারবেজে সরকারি জায়গায় তৈরি করা হয়েছে ‘ছুটি’ নামে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট। সেটি যৌথভাবে পরিচালনা করছে বিমান বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা ও ছুটি গ্রুপ। এছাড়া নুরজাহান সড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে নামে-বেনামে গড়ে উঠছে অসংখ্য কটেজ-রিসোর্ট। জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, বন বিভাগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অসাধু যোগসাজশে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বড় বড় কোম্পানি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। এছাড়া অবৈধ এসব রিসোর্টের শেয়ারহোল্ডার হিসাবে আইনজীবী, ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা, ঢাকায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিক ও সরকারি প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। রিসোর্ট ব্যবসায় ঝুঁকেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা, সেলিব্রেটিরাও। মূলধারার কিছু রিসোর্ট ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, অনেকে স্থানীয়দের কাছ থেকে সামান্য দু-তিন শতক জায়গা কিনে কয়েকটি কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশতেই নেই কোনো সিসি ক্যামেরা, নৈশপ্রহরী বা নিরাপত্তাবেষ্টনী। মালিকরা নিজেরাই ম্যানেজার হয়ে গোপনে পরিচালনা করছেন সবকিছু, যার ফলে ভেতরে কী ঘটছে তা কারও জানা থাকে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক রিসোর্ট ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের নিয়ম মেনে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা কর দিয়ে আমরা ব্যবসা করছি। অথচ কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে নামসর্বস্ব অবৈধ রিসোর্ট করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সুনাম নষ্ট করছে।’ পরিবেশবাদী সাংবাদিক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন, পাহাড়-টিলা কেটে প্রাণির আবাসস্থল ধ্বংস করে রিসোর্ট বানানো হলেও সরকারের কোনো তদারকি নেই। অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা উচিত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, ‘কে রিসোর্ট করছে, কে অনুমতি দিচ্ছে-এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতোমধ্যে একটি তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটি নীতিমালা করা দরকার। মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, জেলায় ৬০টির মতো রিসোর্ট আমাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকিগুলোর অনুমোদন সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, জেলা প্রশাসন মূলত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলো দেখাশোনা করে। ছোটখাটো রিসোর্টগুলো অনুমোদন নিয়ে করছে কিনা, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা নেই।
