ভিক্ষা, ঝিয়ের কাজ করে পড়িয়েছেন সন্তানদের
শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে সাবজিন ও জামিলা * ছেলেমেয়েরা খোঁজ নেয় না
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্তানদের মানুষ করতে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছেন মা। কখনো ভিক্ষা করেছেন। নিজে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। ভেবেছিলেন সন্তানরা বড় হবে, সংসার করবে, শেষ বয়সে আশ্রয়স্থল হবেন তারাই। সন্তানরা বড় হয়েছে। নিজেদের জীবনও গুছিয়েছে। কিন্তু সেই জীবনে মায়েদের জায়গা হয়নি। এখন তাদের ঠিকানা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের নওদাবস গ্রামের ‘নওদাবস মাদ্রাসা ও বৃদ্ধাশ্রম’। চার বছর ধরে এখানেই দিন কাটছে ৬০ বছর বয়সি সাবিজন বেগম ও ৭০ বছর বয়সি জামিলা খাতুনের। দিন যায়, রাত আসে। সন্তানরা তাদের খোঁজ নিতেও আসে না।
সাবিজন বেগমের স্বামী মারা গেছেন। তার দুই ছেলে সাইদুল ইসলাম ও মাইদুল ইসলাম এবং দুই মেয়ে শরীফা খাতুন ও জ্যোসনা খাতুন। চার সন্তানই ঢাকায় চাকরি করেন। চার বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানরা আর তার দেখাশোনা করে না। এখন তার আশ্রয়স্থল বৃদ্ধাশ্রম।
সন্তানদের কথা উঠতেই তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। বলেন, আমার ছেলেমেয়েরা কেউ দেখে না। খুব কষ্টে আছি। কষ্ট করে থাকি। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েরা সবাই ঢাকায় থাকে, সবাই চাকরি করে। আমার খোঁজ কেউ নেয় না। আমি কী খাই, না খাই, কেমন আছি-কেউ ফোনও দেয় না। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন সাবিজন। তার আক্ষেপ, ‘সন্তানদের বেশি শিক্ষিত করতে পারি নাই। আর লেখাপড়া করায়ে কী লাভ হতো, তারা তো আমার কষ্ট দেখে না।’
ভিক্ষা করে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন জামিলা : জামিলা খাতুনের বাড়ি ভাঙ্গামোড় নওদাবস এলাকায়। জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে মানুষের দরজায় দরজায়। কখনো ভিক্ষা করেছেন, কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন। সেই সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়িয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে আফতার ও আকতার এবং দুই মেয়ে ছকিলা ও আয়েশা মায়ের টাকায় বড় হয়েছেন। এখন আর মাকে দেখার সময় নেই তাদের। চার বছর ধরে জামিলা খাতুনের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম। জামিলা বলেন, ‘মানুষের বাড়িতে ভিক্ষা করে, ছওয়ালদের পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত পড়াইছি। ভিক্ষার টাকায় বিয়ে দিছি সবার। তাদের মানুষ করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছুই জমাতে পারিনি। নেই জায়গা-জমি। স্বামীও মারা গেছেন। সন্তানদের জন্য এত কষ্ট করেও এখন আমারে দেখার কেউ নেই। এখন ফোনও দেয় না। খোঁজও নেয় না। কথাও কয় না।’ জামিলার এখন নামাজ-ইবাদত বন্দেগিতে দিন কাটে দিন। তবুও সন্তানদের কথা মনে হলে চোখে পানি আসে। জায়নামাজে বসে সন্তানদের জন্য দুহাত তুলে দোয়া করেন জামিলা। অভিমান থাকলেও সন্তানদের জন্য ভালোবাসা কমে না। চোখের পানি মুছে আল্লাহর কাছে চান-ছেলেমেয়েরা যেন ভালো থাকে, সুখে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃদ্ধাশ্রমটিও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের নওদাবস গ্রামে ২০১৭ সালে স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় নওদাবস মাদ্রাসা ও বৃদ্ধাশ্রম। এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এস এম ফয়সার শামীম। তিনি মধ্যকুমরপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক। বৃদ্ধাশ্রমটির তত্ত্বাবধানে আছেন মাওলানা মো. শেখ সাদী। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আমরা তাদের ভালোভাবে খাওয়াতে পারি না। ভালো কাপড় পরাতে পারি না। আমরা কোনো সরকারি সহায়তা পাই না। প্রায় পাঁচ বছর আগে সমাজসেবা অফিসে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হলেও কাজ হচ্ছে না।’
