Logo
Logo
×

Advertisement

ক্যাম্পাস তারুণ্য

ডাকসু : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এক বছর

Icon

সাদ আদনান রনি

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

‘যেখানে স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্ন বুনতে আসে, যেখানে জীবনের নতুন সূর্য হাসে, নতুন করে নতুন জীবন কথা কয়’-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিকাল নামলে টিএসসি চত্বর এখনো তার চেনা রূপেই ধরা দেয়। চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে, সবুজ ঘাসে গোল হয়ে বসে আড্ডা দেন শিক্ষার্থীরা। কেউ ক্লাস শেষে ছুটছেন হলের দিকে, কেউ লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে বন্ধুর অপেক্ষায়। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জমে ওঠে ছোট-বড় জটলা। এ দৃশ্য বহু বছরের পুরোনো। তবে গত এক বছরে এই চেনা ক্যাম্পাসের আলাপের অভিধানে একটি শব্দ নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে-ডাকসু।

শব্দটি ঠিক নতুন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়সের প্রায় সমান তার ইতিহাস। একসময় যে নামটি বেশি শোনা যেত ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণায়, সেই ডাকসুই দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরেছে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের আলোচনায়। কারও কাছে ডাকসু শিক্ষার্থীদের দাবি জানানোর মঞ্চ। কারও কাছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। কেউ দেখেন প্রশাসন ও শিক্ষার্থীর মাঝখানে একটি সেতু হিসাবে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের সেই ব্যালটের এক বছর পেরিয়েছে। এখন তাই উৎসবের হিসাব নয়, কাজের হিসাব সামনে আসছে। এক বছরে ডাকসু শিক্ষার্থীদের জীবনে আসলে কতটা বদল আনতে পেরেছে?

ছয় বছরের অপেক্ষা শেষে

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সকালটি ছিল অন্য রকম। বহু শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সেটিই ছিল প্রথম ডাকসু ভোট। হল ও ক্যাম্পাসজুড়ে দীর্ঘ সারি, প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা, ভোটকেন্দে র বাইরে উৎসুক শিক্ষার্থী; সব মিলিয়ে নির্বাচনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রাজনৈতিক আবহ তৈরি করেছিল। ভোটের লড়াইও ছিল বড়। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৪৭১ জন প্রার্থী। এক দিনের ভোট শেষ হলো। কিন্তু ফলে জানা গেল বিজয়ী কারা; ডাকসুর সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটি নয়। নির্বাচনে বড় জয় পেল ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮ পদের ২৩টিতেই জয় পান এ প্যানেলের প্রার্থীরা। সহসভাপতি বা ভিপি পদে আবু সাদিক কায়েম পান ১৪ হাজার ৪২ ভোট। সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে এস এম ফরহাদ পান ১০ হাজার ৭৯৪ এবং সহসাধারণ সম্পাদক বা এজিএস পদে মহিউদ্দীন খান পান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট।

নির্বাচনের ফলাফলের আরেকটি দিকও আলোচিত হয়। নারী শিক্ষার্থীদের কয়েকটি হলে শীর্ষ পদে বিজয়ীদের ভোট ছিল উল্লেখযোগ্য। যেমন রোকেয়া হলে সাদিক কায়েম পান ১ হাজার ৪৭২ ভোট; সুফিয়া কামাল হলেও তার ভোট ছিল ১ হাজার ২৭০। বিপরীতে জগন্নাথ হলে শীর্ষ তিন পদে এই প্যানেলের প্রার্থীরা পরাজিত হন। অর্থাৎ সামগ্রিক বড় জয়ের মধ্যেও ক্যাম্পাসের ভিন্ন ভিন্ন অংশে ভোটের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য দৃশ্যমান ছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ব্যালটের অধ্যায় শেষ হলো। শুরু হলো প্রত্যাশার অধ্যায়।

প্রতিশ্রুতির খাতা খুলে

ডাকসুর প্রকাশিত এক বছরের কার্যক্রমের প্রতিবেদনে কিছু কাজ বেশ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স, গবেষণা কর্মশালা, রিসার্চ প্রপোজাল তৈরির প্রশিক্ষণ, স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সেশন এবং শিক্ষা ও চাকরি মেলার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবহণে শনিবার বাসসেবা, সন্ধ্যার ট্রিপ, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বাস এবং সাপ্তাহিক ঢাকা-কুমিল্লা বাসসেবা চালুর কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্র সংস্কার, মেডিকেল ক্যাম্প ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে ডাকসু। এ ধরনের কাজ হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বদলে দেয় না। কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের জীবন ইতিহাসের বড় ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি তৈরি হয় এমন ছোট ছোট সুবিধা দিয়েই। একটি সন্ধ্যার বাস কারও নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা। একটি গবেষণা কর্মশালা কারও প্রথম গবেষণাপত্রের শুরু। একটি মেডিকেল ক্যাম্প অসুস্থ শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক ঘণ্টার স্বস্তি। ছাত্রসংসদের কার্যকারিতার একটি অংশ তাই এই ছোট কাজগুলোর মধ্যেও খুঁজতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো-একই সঙ্গে বড় সমস্যাগুলোও থেকে গেছে।

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আবাসিক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু বিভাগ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে তার হলের ছোট ঘর, ডাইনিংয়ের খাবার, রাতের রিডিংরুম, সকালে অস্বাস্থ্যকর বাথরুম এবং একটি সিঙ্গেল সিটের নিশ্চয়তা। ফলে ডাকসুর সাফল্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি আবাসন। কিন্তু নতুন ভবনের নকশা আর আজ রাতের ঘুমের জায়গা এক জিনিস নয়। সেখানেই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ডাকসু নেতৃত্ব বলছে, খাবারের মান তদারকিতে কমিটি এবং হল সংসদকে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বারবার খাবারে তেলাপোকা, ব্লেড, কেঁচো, জোঁক কী নেই! মোট কথা, খাবারের মানে স্থায়ী পরিবর্তন এখনো নিশ্চিত হয়নি। এমনকি হলের খাবারে পোকামাকড় বা অনাকাক্সিক্ষত বস্তু পাওয়া যেন নিত্য ঘটনা।

নারী ভোটারদের প্রত্যাশার হিসাব

২০২৫ সালের নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক ভোটার ছিলেন নারী। ফলে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা কোনো পার্শ্ববর্তী ইস্যু ছিল না; এটি ছিল নির্বাচনের অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। এক বছরের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা পাওয়া যায়। নিরাপদ পরিবহণের জন্য নতুন বাস, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, বিভিন্ন হলে হাইজিন পণ্য, কমনরুম সংস্কার এবং কিছু নারীকেন্দ্রিক সুবিধার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ডাকসু নেতৃত্ব জানিয়েছে। তবে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের কিছু সুবিধা, সব কমনরুমে নারী কর্মী এবং হলে অভিভাবকদের জন্য নির্ধারিত জায়গার মতো কিছু অঙ্গীকার অসম্পূর্ণ থাকার কথা উঠে এসেছে। নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত একটি সংস্কৃতি। রাত নয়টার পর একজন ছাত্রী কতটা নিশ্চিন্তে ক্যাম্পাস পার হতে পারেন, অভিযোগ করলে তিনি কতটা গুরুত্ব পান, অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কোথায় যাবেন-এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েই নারীবান্ধব ক্যাম্পাসের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয়। এগুলোর কোনোটাই এখনো বাস্তবে মেলেনি।

অর্জনের পাশে অস্বস্তির প্রশ্ন

ডাকসুর এক বছরকে শুধু ‘কাজ হয়েছে’ অথবা ‘কাজ হয়নি’ এ দুই বাক্সে রাখা কঠিন। এর মূল্যায়ন গতানুগতিক নয়। একদিকে অনেক কার্যক্রম। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন; ছাত্রসংসদের কাজের সীমা কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়েছে অবকাঠামোগত কাজ এবং বাইরের সহায়তা গ্রহণ নিয়ে। ডাকসু নেতৃত্ব বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া ৩৫ লাখ টাকার বিপরীতে তাদের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকার বেশি এবং বাকি সহায়তা এসেছে বাইরের উৎস থেকে। এর মধ্যে মেডিকেল সেন্টার ও কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কার এবং হলের রিডিংরুমে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপনের মতো কাজ রয়েছে। কিন্তু এই অর্থ বা সহায়তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রশ্ন তুলেছে।

প্রশাসন বনাম ডাকসু

এক বছরের হিসাব দিতে গিয়ে ডাকসু নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছে। ভিপি সাদিক কায়েমের ভাষ্য, নির্ধারিত বাজেটও সময়মতো পাওয়া যায়নি এবং অনেক কাজে প্রশাসনিক সহযোগিতা মেলেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এই টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়েছে। ডাকসুর নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালু করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক আপত্তি জানান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বলে, অনুমোদন ছাড়া সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির সুযোগ নেই। ডাকসুর বক্তব্য ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা উদ্যোগটি নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে তাদের নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বিরোধটি শুধু একটি ওয়েবসাইট নিয়ে নয়। এর ভেতরে আছে আরও বড় প্রশ্ন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধির সক্রিয়তার সীমা কোথায় শেষ হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তৃত্ব কোথা থেকে শুরু হবে? কাজের তালিকা, নাকি ফলাফলের খাতা? ডাকসু বলছে, ৪১ খাতে হাজারের বেশি উদ্যোগ। সমালোচকরা বলছেন, আবাসন, খাবার ও নিরাপত্তার মতো মূল প্রতিশ্রুতিতে অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। দুই বক্তব্যই একই সময়ে সত্যের একটি করে অংশ ধারণ করতে পারে।

কারণ উদ্যোগ আর ফল এক নয়। একটি কমিটি করা উদ্যোগ। খাবারের মান স্থায়ীভাবে ভালো হওয়া ফল। নতুন হলের দাবি তোলা উদ্যোগ। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর বৈধ আসন পাওয়া ফল। নিরাপত্তা নিয়ে সভা করা উদ্যোগ। নারী শিক্ষার্থীদের রাতে নিশ্চিন্তে ক্যাম্পাসে হাঁটতে পারা ফল। অভিযোগের ব্যবস্থা তৈরি উদ্যোগ। অভিযোগের প্রতিকার পাওয়া ফল। এ ব্যবধানটিই সম্ভবত ডাকসুর প্রথম বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। অর্থাৎ ডাকসু ফিরে আসার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি প্রকল্প নয়। হতে পারে জবাবদিহির প্রশ্নটি ফিরে আসা। এর সুফল পাওয়া যাবে এ সংস্কৃতিটি চলমান থাকলে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ডাকসু : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এক বছর

ডাকসু : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এক বছর

ডাকসুর চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবেন শিক্ষার্থীরা

ডাকসুর চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবেন শিক্ষার্থীরা

ইশতেহারের অধিকাংশ বিষয় নিয়ে কাজ করেছি

ইশতেহারের অধিকাংশ বিষয় নিয়ে কাজ করেছি

নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নাকি পুরোনো জটিলতা

নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নাকি পুরোনো জটিলতা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম