Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

রমজানে আভিজাত্যের রসনা

কয়েক দশক ধরে হালিম ইফতারের অংশ

Advertisement

Icon

খোরশেদ আলম সীমান্ত শাহবাগ (ঢাকা)

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েক দশক ধরে হালিম ইফতারের অংশ

রাজধানীর বংশালে রোববার মুখরোচক হালিম কিনছেন ক্রেতারা -যুগান্তর

Advertisement

পুরান ঢাকার সরু গলি থেকে বনানীর সুপ্রশস্ত রাজপথ, আছরের আজান শেষ হতে না হতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক ম ম ঘ্রাণ। ডাল, মাংস আর হরেক পদের মসলার সেই জাদুকরী মিশ্রণের নাম ‘হালিম’। ঢাকার ইফতার টেবিল মানেই যেন এক বাটি ধোঁয়া ওঠা হালিম, উপরে ছিটিয়ে দেওয়া আদা কুচি, ধনেপাতা আর বেরেস্তা। গত কয়েক দশকে হালিম কেবল একটি খাবার নয়, বরং ইফতার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। পুষ্টিকর খাবার আর স্বাদের জন্য নয়, বরং ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কারণেও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে হালিম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে বাংলাদেশের রান্নাঘরে জায়গা করে নেওয়া হালিম আজ এক সাংস্কৃতিক খাবারেও পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শরিফ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হালিমের আদি নিবাস সুদূর আরবে। তখন এর নাম ছিল ‘হারিসা’। দশম শতাব্দীতে বাগদাদের রান্নার বইতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখান থেকে মুঘল আমলের হাত ধরে এই খাবারটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তবে ঢাকাইয়া হালিম নিজস্ব স্বকীয়তায় অনন্য। মূলত আশির দশকের পর থেকে ঢাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ইফতারিতে হালিমের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। আগে এটি কেবল উচ্চবিত্ত বা নওয়াব পরিবারের খানা থাকলেও এখন তা সাধারণের সাধ্যের মধ্যে চলে এসেছে।

হালিম মূলত প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের এক শক্তিশালী সংমিশ্রণ। এতে থাকা বিভিন্ন প্রকারের ডাল (মুগ, মাসকলাই, খেসারি, ছোলা) ও গমের মিশ্রণ শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সাইদুল আরেফিন যুগান্তরকে বলেন, হালিমে ব্যবহৃত ডালগুলো উদ্ভিজ্জ আমিষের চমৎকার উৎস। সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজ ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে এটি সহায়ক। তবে অতিমাত্রায় তেল ও মসলা হজমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে পোড়া তেল বা কয়েক দিনের ব্যবহৃত তেল দিয়ে রান্না করা হালিম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। স্বাস্থ্যকর উপায়ে ঘরে তৈরি হালিম সব সময় সেরা।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোজাফফর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হালিমে থাকা আদাকুচি ও লেবুর রস হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তবে অতিরিক্ত লাল মাংস বা চর্বি ব্যবহারের ক্ষেত্রে হার্টের রোগীদের সতর্ক থাকা জরুরি। এছাড়া বাইরে থেকে কিনে খাওয়ার চেয়ে ঘরে তৈরি হালিম শরীরের জন্য ভালো। কেননা বাইরে যারা রান্না করছেন তারা কী কী উপাদান দিচ্ছেন, কতটুকু দিচ্ছেন, পানি কতটুকু ভালো দিচ্ছেন তা আমরা দেখতে পাই না। এতে বাইরের তৈরি হালিমে অনেকটা স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে যায়। তবে রোজা শেষে ইফতারিতে হালিম কম খাওয়াটাই ভালো। ঢাকা শহরে বর্তমানে হালিমের নানারকম সংস্করণ পাওয়া যায়। মাংসের ভিন্নতা অনুযায়ী এটি সাধারণত চার প্রকার :

খাসির হালিম : এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আভিজাত্যের প্রতীক। গরুর মাংসের হালিম : সহজলভ্যতা ও স্বাদের কারণে এর চাহিদা তুঙ্গে। মুরগির মাংসের হালিম : যারা লাল মাংস এড়িয়ে চলেন, তাদের জন্য এটি প্রিয়। হাঁসের মাংসের হালিম : বিশেষ করে শীতকালীন রমজানে কিছু নির্দিষ্ট দোকানে এটি পাওয়া যায়।

ঢাকার একেক এলাকার হালিমের স্বাদ যেমন ভিন্ন, দামেও রয়েছে তেমন তফাৎ। পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী মসলা ও ঘি দিয়ে তৈরি হালিম পাওয়া যাবে ২০০-১৫০০ টাকার মধ্যে। ধানমন্ডি ও জিগাতলার হালিমে রয়েছে ঘ্রাণ ও ঘনত্বের ভারসাম্য। পাওয়া যাবে ২৫০-১২০০ টাকা পর্যন্ত দামে। প্রিমিয়াম পরিবেশনা ও কম ঝালের হালিম পাওয়া যায় বনানী ও গুলশান এলাকায়। দাম পড়বে ৪০০-২৫০০ টাকা পর্যন্ত। উত্তরা এলাকার হালিম আধুনিক ও ফিউশন স্বাদে পূর্ণ। দাম ৩০০-১৮০০ টাকা পর্যন্ত। পুরান ঢাকার বিউটি বা রয়েল রেস্টুরেন্টের হালিম যেমন জিভে পানি আনে, তেমনি ধানমন্ডির মামা হালিম এখন ঢাকার কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বেইলি রোডের নবাবী ভোজ, পিঠাঘর ও ক্যাপিটাল ফুডের হালিমও বেশ জনপ্রিয়। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, ইফতারিতে অনেক কিছু থাকলেও হালিম ছাড়া তৃপ্তি আসে না। বিশেষ করে হালিমের বাটিতে চামচ ডুবিয়ে আদা আর ধনেপাতার মিশ্রণটা মুখে দিলেই সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

আবার শেরেবাংলা নগরের গৃহিণী ফাহমিদা সুলতানা বলেন, বাইরের হালিম অনেক সময় বেশি মসলাযুক্ত হয়, তাই আমি বাসায় সব পদের ডাল ভিজিয়ে স্বাস্থ্যকরভাবে বানানোর চেষ্টা করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শরীফউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে আরও বলেন, হালিম কেবল খাবার নয়, এটি ঢাকার সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীক। আগে পাড়ায় পাড়ায় বড় ডেকচিতে হালিম রান্না হতো ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এই ‘শেয়ারিং কালচার’ হালিমকে আজও টিকিয়ে রেখেছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

একনেকে প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনা তিন বছরে সড়কের ক্ষতি হলে দায়ী ঠিকাদার

তিন বছরে সড়কের ক্ষতি হলে দায়ী ঠিকাদার

দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বৈঠক আজ শুরু

দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বৈঠক আজ শুরু

সার সংকটে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কা সিংড়ায় কৃষকদের হয়রানি মানিকগঞ্জে উত্তেজনা

সিংড়ায় কৃষকদের হয়রানি মানিকগঞ্জে উত্তেজনা

ভৈরবে তোলপাড় অর্থের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দিলেন ওসি

অর্থের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দিলেন ওসি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম