তিন সরকারি মেডিকেলে গবেষণা
দশজনে সাত প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসক অবসাদে
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ পেশাগত অবসাদে ভুগছেন। তিনটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭০৩ জন প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসককে নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় ৭০ শতাংশের মধ্যে পেশাগত অবসাদ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ চিকিৎসকের মধ্যে নিজের পেশাগত অর্জন নিয়ে সন্তুষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল সিরিজের বিএমজে ওপেন জার্নালে সম্প্রতি গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। ট্রপিক্যাল ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং পাই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের গড় বয়স ৩১ বছর। তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ নারী। অংশগ্রহণকারীরা মেডিসিন, সার্জারি এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে এফসিপিএস, এমডি, এমএস, ডিপ্লোমা ও এমফিল কোর্সে প্রশিক্ষণরত ছিলেন।
গবেষণায় দেখা যায়, ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিৎসকের মধ্যে তীব্র মানসিক ও আবেগীয় ক্লান্তি এবং ৫৮ শতাংশের মধ্যে রোগী বা কাজের প্রতি মানসিক দূরত্ব তৈরির প্রবণতা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ চিকিৎসকের মধ্যে নিজের পেশাগত অর্জন নিয়ে সন্তুষ্টির ঘাটতি পাওয়া গেছে।
প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের দৈনিক গড় ঘুম ছিল ৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা। ৬৪ শতাংশ দিনে সাত ঘণ্টার কম ঘুমান। সাত ঘণ্টার কম ঘুমানো চিকিৎসকদের ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে পেশাগত অবসাদ পাওয়া গেছে। বিপরীতে সাত ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমানো চিকিৎসকদের মধ্যে এ হার ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, গবেষণাটি একই সময়ে চিকিৎসকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে হওয়ায় কম ঘুমই অবসাদের সরাসরি কারণ-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রেও চাপের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকেরা সপ্তাহে গড়ে ৫৭ ঘণ্টা কাজ করেন। ৬৭ শতাংশের বেশি সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ চিকিৎসক তাদের বর্তমান প্রশিক্ষণ নিয়ে অসন্তুষ্ট। ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ বিশেষায়িত বিষয় পরিবর্তনের কথা ভেবেছেন। ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসা পেশা পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করেছেন এবং ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ বিদেশে যাওয়ার কথা ভেবেছেন। এছাড়া ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসক বাড়তি আয়ের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অন্য কাজ করেন। এসব কাজের মধ্যে অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা, ব্যক্তিগত চেম্বার ও টিউশনি রয়েছে। পেশাগত চাপ বেশি থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা কম। মাত্র ১১ দশমিক ৯ শতাংশ চিকিৎসক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৬ দশমিক ১ শতাংশ ওষুধ ব্যবহারের কথা বলেছেন। গবেষকদের মতে, প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের পেশাগত অবসাদকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসাবে দেখলে চলবে না। কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম, আর্থিক চাপ এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীরা যথাযথ তত্ত্বাবধান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তাদের কাজের মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
