ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনা
একদিনে চার কবর, থেমে গেল ৪ প্রজন্মের জীবন
Advertisement
মাহফুজুর রহমান, জামালপুর
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চারটি খাটিয়া। চারটি নিথর দেহ। চারটি কবর। অথচ মানুষগুলো ছিলেন একই পরিবারের চার প্রজন্মের সদস্য-দাদি, ছেলে, নাতনি ও নাতনির ছেলে। শুক্রবার দুপুরেও যারা ছিলেন আপনজনদের মাঝে, শনিবার দুপুরে তাদের ঠিকানা হলো মাটির নিচে। একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই নিভিয়ে দিল একটি পরিবারের চারটি প্রাণ; সঙ্গে কেড়ে নিল আরও তিনটি জীবন।
শুক্রবার দুপুর থেকে জামালপুর সদরের রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে মাতম থামছেই না। যে বাড়িতে মা, ছেলে, ছেলের মেয়ে ও ছেলের নাতির হাসি-কোলাহল ছিল, সেই বাড়িতেই একসঙ্গে চারটি লাশ। শনিবার সকালে ওই বাড়িতে এই দৃশ্য দেখা যায়। পার্শ্ববর্তী গোড়ারকান্দা এলাকায়ও চলছিল আহাজারি। শনিবার সকালে স্বজন, প্রতিবেশী আর এলাকাবাসীর ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস। কেউ কাঁদছিলেন স্বজন হারানোর বেদনায়, কেউবা নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখছিলেন প্রিয় মানুষগুলোর নিথর লাশ।
দাদি, ছেলে, নাতনি ও নাতনির ছেলে-চার প্রজন্মের এই ছোট্ট পরিবারটি শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন গাজীপুরের উদ্দেশে। কেউ জানতেন না, এই যাত্রাই হবে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা। শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া বাইপাস এলাকার গন্দ্রপা মোড়ে রাজীব পরিবহণের একটি বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তারাসহ নিহত হন সাতজন। নিহত ওই চারজন হলেন জামালপুর সদরের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন লেবু, তার মা রাশিদা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা বেগম ও মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সি ছেলে মিনান।
শনিবার সকাল ৯টার দিকে গোড়াকান্দা এলাকায় জানাজা হয় মর্জিনা বেগম ও তার পাঁচ বছর বয়সি ছেলে মোজাব্বিদ ইসলাম মিনানের। এরপর তাদের লাশ দাফন করা হয় স্থানীয় কবরস্থানে। সকাল ১০টার দিকে দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়ায় জানাজা হয় মোফাজ্জল হোসেন লেবু ও তার মা রাশিদা বেগমের। পরে তাদের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়। একই সময়ে জামালপুরের অন্য এলাকায় লাশ দাফন করা হয় দুর্ঘটনায় নিহত অটোরিকশাচালক সুজন আলী এবং আকরাম আলী ও মমতা বেগম দম্পতির।
জানা যায়, মোফাজ্জল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন। মাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনানও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য আকুতি করায় চারজন একসঙ্গে রওয়ানা হন। নান্দিনা বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ হয়ে সেখান থেকে বাসে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যায় তাদের পথচলা।
মোফাজ্জলের ছোট ভাই মোবারক হোসেন বলেন, ভাই মাকে গাজীপুরে নিয়ে যাওয়ার কথা আমাকে বলেন। মেয়ে ও নাতিও সঙ্গে যেতে চাওয়ায় চারজন একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। আমি এটাকে দুর্ঘটনা বলব না। এটা পরিকল্পিতভাবে হত্যা। আমি এর বিচার চাই।
৭০ বছর বয়সি রহিমা বেগম। দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন জামাতা মোফাজ্জল, নাতনি মর্জিনা, নাতনির ছেলে মিনান এবং বেয়াইন রাশিদাকে। বুক চাপড়ে তিনি বলছিলেন, আমার জামাই, নাতিন পুতিও মইরা গেছে, সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো। কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এলাকায় এমন ঘটনা আগে কোনোদিন ঘটেনি। আগে টেলিভিশনে একই পরিবারের কয়েকজনের মৃত্যুর খবর দেখেছি। কিন্তু এবার নিজের এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। পুরো এলাকাবাসী শোকে স্তব্ধ।
শুধু মোফাজ্জলদের পরিবার নয়, একই দুর্ঘটনায় জামালপুরের বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী ও তার স্ত্রী মমতা বেগমও প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার তাদেরও জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো অটোরিকশাচালক সুজন আলীকেও দাফন করা হয়েছে তার নিজ গ্রামে।
আকরামের চাচাতো ভাই আব্দুল কাদের বলেন, আমার ভাই ও তার স্ত্রী মারা যাওয়ায় আমাদের পরিবারটা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল। তিনি দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জামালপুর বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শুভ জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। রোববার রাজীব পরিবহণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসবে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। সভা শেষে নিহতদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসি শিবিরুল ইসলাম জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। বাসটি জব্দ করে থানায় আনা হয়েছে এবং চালককে আটকের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে জামালপুর সদর উপজেলার ইউএনও নাজনীন আখতার জানান, বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সব পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জেলার বাস সার্ভিস উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
