Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

বরিশালের জনপদ-চরাচরে হাহাকার

নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে মানচিত্র

আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যাসহ আট নদীর ৬০ কিমি. এলাকায় ভাঙন * বসতঘর, পানের বরজ, সুপারি বাগান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ নানা স্থাপনা বিলীন * ভাঙনরোধে কাজ হচ্ছে, ২৭ বিদ্যালয় রক্ষা পেয়েছে : পাউবো

Advertisement

Icon

অনিকেত মাসুদ, বরিশাল

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

এক সময় যেখানে ছিল বসতভিটা, ফসলের মাঠ, বাজার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেখানে এখন নদীর প্রবহমান পানি। কোথাও ঘর সরিয়ে নেওয়ার আগেই নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, কোথাও বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে এসেছে ভাঙনের একেবারে কিনারে। গত বছর যে তীরে মানুষ ঘর তুলেছিল, এ বছর সেই তীরই বিলীন হয়েছে নদীতে। বহু বছর ধরে চলা এই ভাঙনে বদলে যাচ্ছে বরিশালের জনপদের চেহারা, উঠেছে হাহাকার। ঠিকানা হারিয়ে অনেকে আশ্রয় নিচ্ছেন অন্যের জমিতে, কেউবা ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে।

বর্ষা মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৮টি নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ আটটি নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় বর্তমানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।

গত ১০ বছরের স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যবেক্ষণ করে মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী, বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার তীর ভেঙে বড় হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পেয়েছে পাউবো। এভাবে দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে বরিশালের মানচিত্র।

বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন : সেপ্টেম্বরেই মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার নদীতীরে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। মাত্র পাঁচ দিনে মেহেন্দিগঞ্জের চরগোপালপুর ও আলিমাবাদে ৪১টি বসতঘর এবং একটি বাজারের প্রায় ৩০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে পরিবারগুলো ঘরবাড়ি ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকেই হারাচ্ছেন জীবিকার শেষ অবলম্বন।

মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর ও ইলিশা নদীবেষ্টিত মেহেন্দিগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই বরিশালের অন্যতম নদীভাঙনপ্রবণ উপজেলা। ২০১৭ সালে শ্রীপুর ইউনিয়নের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জমি, বসতঘর, পানের বরজ, সুপারি বাগান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ভূমি অফিস ও মসজিদ কালাবদর ও তেঁতুলিয়ার নদীতে চলে যায়। মেঘনা, ইলিশা ও কালাবদরের ভাঙন থামেনি।

সেপ্টেম্বরে মাত্র পাঁচ দিনে চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে ৪১টি বসতঘর এবং একটি বাজারের প্রায় ৩০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাহাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হিজলা উপজেলায় অনেক পরিবার একাধিকবার বসতভিটা হারিয়েছে।

বর্তমানে মান্দ্রা, চর কুসরিয়া, ঘোষেরচর, অরাকুল, দুর্গাপুর লঞ্চঘাট ও চর দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন চলছে। ২০২৬ সালে ভাঙনরোধে প্রস্তাবিত ১৫টি জরুরি প্রকল্পের মধ্যে হিজলার জন্য একটি প্রকল্প রাখা হয়েছে। বাকি ১৪টি প্রকল্প মেহেন্দিগঞ্জের জন্য।

সত্তরোর্ধ্ব নুর মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, ‘যে মাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজ তার পুরোটাই মেঘনা নদীতে। পাকা ঘরবাড়ি, ধানি জমি, বাপ-দাদার ভিটে-সবকিছু চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে।’ রাবেয়া বেগম বলেন, ‘আমরা ত্রাণ চাই না, শেষ সম্বলটুকু রক্ষার জন্য টেকসই বাঁধ চাই।’

যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত : আড়িয়াল খাঁ ও জয়ন্তী নদীর ভাঙনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত মুলাদীর চরকালেখান, নাজিরপুর, সফিপুরসহ নদীতীরবর্তী এলাকা। বসতভিটা ও ফসলি জমির পাশাপাশি বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি এলাকা নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগ ফেলেছে পাউবো। বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে গত কয়েক বছরে সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দুই শতাধিক বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে সুগন্ধার ভাঙনে বাবুগঞ্জ বাজারসংলগ্ন প্রায় ২০০ গজ এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, কালাবদরের তাণ্ডবে চরমোনাই এবং আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে চরবাড়িয়ার লামচরী গ্রামের কয়েকশ পরিবার গত দেড় দশকে ভিটেমাটি হারিয়েছে। কেউ কেউ তিন থেকে চারবার পর্যন্ত নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন।

শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনের কবলে পড়ে হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। চরবাড়িয়ার বাসিন্দা বৃদ্ধ আবদুল মোতালেব বলেন, ‘নদী সবকিছু নিয়ে গেছে। এখন আর কোনো জমি নেই। বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে ভাড়া থাকি।’

সচেতন নাগরিক সমাজ বরিশালের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।’ বরিশাল পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, এ বছর ২৭টি বিদ্যালয় ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করা হয়েছে। নদীতীর ঝুঁকিমুক্ত করতে কাজ হচ্ছে।

বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদীর ভাঙন রোধের দাবিতে মানববন্ধন : বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদীর ভাঙন থেকে বাহেরচর ঘোষকাঠি ও বাহেরচর বাজার রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। দেহেরগতি ইউনিয়নের বাহেরচর বাজারসংলগ্ন নদীর তীরে বাজার ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে শনিবার সকালে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভাঙনকবলিত মানুষ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন হেমায়েত। বক্তব্য দেন বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম শিহাব, মো. সুলতান, সোহাগ হোসেন, আবু সায়েমসহ স্থানীয়রা। বক্তারা বলেন, সন্ধ্যা নদীর দুই তীরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। প্রতিবছর নদীভাঙনে হাজারো মানুষ বসতভিটা ও আবাদি জমি হারাচ্ছেন। ২০২০ সাল থেকে নদীভাঙন রোধে মহাপরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মিটফোর্ডে দালালচক্রে জিম্মি রোগী ডিউটি ফাঁকি দিয়ে ক্লিনিকে ছোটেন চিকিৎসক

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে ক্লিনিকে ছোটেন চিকিৎসক

বরিশালের জনপদ-চরাচরে হাহাকার নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে মানচিত্র

নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে মানচিত্র

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনা একদিনে চার কবর, থেমে গেল ৪ প্রজন্মের জীবন

একদিনে চার কবর, থেমে গেল ৪ প্রজন্মের জীবন

মাধ্যমিক স্তর প্রশিক্ষণ পাবেন ৩ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষক

প্রশিক্ষণ পাবেন ৩ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম