বিসিএস ছেড়ে শিশুদের পড়ান প্রকৌশলী নায়লা
প্রান্তিক শিশুদের গড়ে তুলছেন মানুষ হিসাবে
Advertisement
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন নায়লা শারাফ। তিনি জনতা ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলেন এবং ৩৪তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। প্রচলিত অর্থে ভালো বেতন, পদমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার সুযোগ-সবই ছিল তার। কিন্তু এর কোনোটিই তাকে ধরে রাখতে পারেনি। নায়লা শারাফ শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। সাত বছর ধরে তিনি নেত্রকোনা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পড়ানো ও তাদের মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাকেই তিনি জীবনের বড় অর্জন মনে করছেন। নায়লার শিক্ষাজীবনের শুরু হয়েছিল রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর বুয়েট থেকে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে কাজের পরিবেশ ও কিছু অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর যোগ দেন জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে। কিন্তু ব্যাংকের চাকরির ‘যান্ত্রিকতা’ও তাকে টানেনি। পরে ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও সেই চাকরিতে যোগ দেননি। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই তিনি পেশা হিসাবে বেছে নেন।
উচ্চ বেতন ও সামাজিক মর্যাদার সুযোগ ছেড়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে নায়লা শারাফ বলেন, ‘অর্থ বা খ্যাতির প্রতি কোনো মোহ নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি। দিন শেষে একটা নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।’
শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় নায়লার পাঠদান। শিক্ষার্থীদের সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন তিনি। কোনো কাজ সঠিক কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে তিনি শিশুদের উৎসাহিত করেন। পাঠদানকে আনন্দময় ও সহজ করতে বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরেও কাজ করেন নায়লা। নিজের হাতে ছবি আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ তৈরি করেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক বলেন, ‘বুয়েটে পড়েও তিনি যেভাবে প্রান্তিক শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি আমাদের বিদ্যালয়ের অমূল্য সম্পদ।’ নায়লার এই সিদ্ধান্ত স্বজন ও পরিচিত অনেকের কাছে একসময় ‘পাগলামি’ মনে হয়েছিল। তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং শৈশবে ভিকারুননিসায় যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন সেই সুযোগ পায়-এটাই তার প্রত্যাশা।
নায়লা বলেন, ‘অন্য বিভাগে থাকলে হয়তো অনেক টাকার মালিক হতাম, সবাই মেধাবী বলত। কিন্তু এখানে আমি ভালোবাসা পাই। বাচ্চারা যখন এসে ভালোবাসা জানায়, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।’ দেশের মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষায় আসার আহ্বান জানিয়ে নায়লা শারাফ বলেন, প্রতিদানের আশা না করে শুধু দেওয়ার মানসিকতা থাকলেই প্রাথমিক শিক্ষায় আসা উচিত। তার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সম্মানজনক একটি পেশা। বাংলাদেশেও এই পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব, যদি মেধাবী ও আন্তরিক তরুণরা এতে এগিয়ে আসেন।
