শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল
অনুমোদন ছাড়াই এসবির ইমিগ্রেশন সার্ভার
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে অনুমোদিত নকশা ও বরাদ্দের সীমা ছাড়িয়ে ইমিগ্রেশন সিকিউরিটি ও সার্ভার রুম নির্মাণ করছে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)। এক হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গার অনুমোদন থাকলেও প্রায় তিন হাজার ৮০০ বর্গফুটের নকশা দিয়েছে সংস্থাটি। জায়গা বৃদ্ধির আবেদন নিষ্পত্তির আগেই বেইজমেন্টে নির্মাণকাজ শুরু করে তারা। এ ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বেবিচকে। এ নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হলেও সুরাহা হয়নি।
অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে এসবির ভূমিকা নিয়ে, প্রশ্নের মুখে পড়েছে বেবিচকের তদারকি ব্যবস্থা। টার্মিনাল চালুর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুমোদনহীন নির্মাণ, পরিবর্তনশীল নকশা ও জায়গার হিসাব নিয়ে দুই সংস্থার চিঠি চালাচালিতে তৈরি হয়েছে কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা।
জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য প্রশাসন এসএম লাবলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তৃতীয় টার্মিনালে স্থাপনা নির্মাণ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার চাহিদা ও কারিগরি প্রয়োজন বিবেচনা করেই জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হলে যথাযথ প্রস্তাব ও নকশা দিয়ে অনুমোদন নিতে হবে। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কারিগরি প্রয়োজন যাচাই করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে এসবির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি কন্ট্রোল বিভাগের ডিআইজি মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সূত্রমতে, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান ও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ করেছে। এর বাইরে গিয়ে যত্রতত্র ইটের দেওয়াল নির্মাণের সুযোগ নেই। সূত্রগুলোর দাবি, এ ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নির্ধারিত প্রটোকল এবং প্রযোজ্য সিভিল এভিয়েশন রুলসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এ বিষয়ে বেবিচক ও এসবির মধ্যে গত ১২ দিনে চার দফা চিঠি চালাচালি হয়েছে।
চিঠিগুলোতে জায়গার বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন, নির্মাণকাজ এবং সার্ভার রুমের অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুই সংস্থার মুখোমুখি অবস্থান স্পষ্ট। যুগান্তরের হাতে আসা বেবিচক ও এসবির চিঠি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বেবিচকের প্রকল্প পরিচালক চিঠি দিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের বেজমেন্টে (গ্রিড ২৬-২৭) ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইএমএস) স্থাপনের জন্য প্রায় এক হাজার ৫০০ বর্গফুট (৬৫ ফুট বাই ২৩ ফুট) জায়গা নির্দিষ্ট শর্তে বরাদ্দের অনুমোদন দেন।
এরপর ৩ অক্টোবর এসবির ডিআইজি (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি) চিঠি দিয়ে জানান, ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত ক্রিটিক্যাল আইসিটি অবকাঠামোর জন্য এক হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গা ‘একেবারেই অপ্রতুল’। সিলিংয়ের উচ্চতাও কম। বেবিচকের বরাদ্দ প্রত্যাখ্যান করে এসবি নিজেদের তৈরি ‘এসবি ইমিগ্রেশন সার্ভার লেআউট’ নকশা পাঠায়। এতে সার্ভার রুম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর জন্য দুই হাজার ৫৩০ বর্গফুট জায়গা চাওয়া হয়। চিঠিতে এসবি জানায়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল আইসিটি অবকাঠামো, ২৪/৭ সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম, সার্ভার র্যাক ও ফায়ার সাপ্রেশন সিস্টেম স্থাপনের জন্য বেবিচকের বরাদ্দ করা জায়গা যথেষ্ট নয়। বরাদ্দ স্থানের সিলিংয়ের উচ্চতা ৮ ফুট। আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও অবকাঠামো স্থাপনে এ উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
৫ অক্টোবর বেবিচকের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, এসবি তাদের জমা দেওয়া নকশার অনুমোদন না নিয়েই নির্ধারিত জায়গার বাইরে গিয়ে ইটের দেওয়াল নির্মাণ করছে। অথচ কাজ শুরুর আগে ড্রয়িং ও ডিজাইন বেবিচকের কাছে জমা দিয়ে অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এমনকি ইমিগ্রেশন সার্ভার রুমের জন্য নির্ধারিত জায়গা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে বেজমেন্টের মূল সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ-এফএডি নোজল ও ডাক্ট-সরানোর দাবিও জানায় এসবি। বিমানবন্দরের মূল নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিপন্থি হওয়ায় বেবিচক ওই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেয়। একই সঙ্গে সার্ভার রুমের নির্মাণকাজ এক হাজার ৫০০ বর্গফুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। বেবিচকের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, কোনো ধরনের ড্রয়িং ও ডিজাইন প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন ও অনুমোদন না নিয়েই এসবি নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে ৮ অক্টোবর এসবিকে জরুরি চিঠি দেয় বেবিচক। এতে বলা হয়, এর আগে এসবি সার্ভার রুমের জন্য তিন হাজার ৮০০ বর্গফুট জায়গার চাহিদা জানিয়েছিল। পরে ৩ অক্টোবরের নকশায় চাওয়া হয়েছে দুই হাজার ৫৩০ বর্গফুট, বেবিচকের পক্ষ থেকে অনুমোদন হয়েছে মাত্র এক হাজার ৫০০ বর্গফুট।
একই স্থাপনার জন্য জায়গার চাহিদায় এমন বড় ধরনের অমিলের কারণ জানতে চেয়ে এসবির কাছে ব্যাখ্যা চায় বেবিচক। একই সঙ্গে সার্ভার রুমে স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত সব ইকুইপমেন্টের চূড়ান্ত তালিকাও তলব করা হয়।
চিঠিতে বেবিচক উল্লেখ করে, জায়গার চাহিদা, নকশা ও তথ্যের মধ্যে এ ধরনের অসঙ্গতি এবং তথ্যের অস্পষ্টতা বিমানবন্দরের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগে ইমিগ্রেশন অবকাঠামোর বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। কারণ সার্ভার রুম বা কন্ট্রোল সেন্টারের অবস্থান নির্ধারণের সঙ্গে শুধু একটি কক্ষের আয়তন নয়, নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ, কুলিং, ফায়ার সেফটি, নিরাপদ প্রবেশাধিকার এবং টার্মিনালের অন্যান্য সিস্টেমের সমন্বয় জড়িত।

