স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বরাদ্দের টাকায় নেতার বাড়ির রাস্তা সংস্কার
চরফ্যাশনে কর্দমাক্ত পথে গর্ভবতী ও রোগীদের চরম ভোগান্তি * ‘সরকারি কর্মকর্তারা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন না, এটা বুঝতে হবে’
Advertisement
চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোলা জেলার চরফ্যাশনে কাগজে-কলমে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল গর্ভবতী নারী এবং সাধারণ রোগীদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের সুবিধার্থে কর্দমাক্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য। কিন্তু বাস্তবে সেই সরকারি টাকায় পাকা করা হয়েছে স্থানীয় নেতার বাড়ির প্রবেশপথ। উপজেলার চর মাদ্রাজ ইউনিয়নে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির টাকা এভাবে নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিআর কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে দুই ধাপে ৪০০ মিটার রাস্তার সলিংকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নির্দেশনায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিল চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কেরামতগঞ্জ বাজারের মূল সড়ক থেকে উত্তর দিকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কার করতে হবে। তবে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রাস্তাটি আগের মতোই অবহেলিত ও কর্দমাক্ত রয়ে গেছে। আর বরাদ্দের টাকায় পাকা করা হয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতা ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফখরুদ্দিন শাহিন মালতিয়ার বাড়ির প্রবেশপথ।
কর্দমাক্ত পথ, রোগীদের সীমাহীন ভোগান্তির শিকার স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বর্ষা মৌসুমে কেরামতগঞ্জ বাজারসংলগ্ন চরমাদ্রাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী এবং আশঙ্কাজনক রোগীদের এই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা-নেওয়া করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার সবুজ (যিনি এলাকায় ‘ব্যাটারি সবুজ’ নামে পরিচিত), কাজের অনিয়ম প্রশ্নে বলেন, ‘আগে যা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। আমি পকেটের টাকা দিয়ে হাসপাতালের সামনের রাস্তা পাকা করে দেব।’ ঠিকাদারের এমন দায়সারা বক্তব্য ও পকেটের টাকা দিয়ে সরকারি হাসপাতালের রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই প্রমাণ করে যে, অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ না করে বরাদ্দের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ওয়ালিউল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে তিনি বিষয়টি জানতেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিকাদারকে বারবার বলেছি, অন্য কিছু যা হয়েছে, অন্তত হাসপাতালের সামনের রাস্তাটি যেন পাকা করা হয়। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি।’ কাজ যথাযথ না হওয়ার পরও বরাদ্দের অর্থ কেন আটকে দেওয়া হলো না এমন প্রশ্নের জবাবে পিআইও নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন না, এটা আপনাকে বুঝতে হবে।’
প্রকল্পের সভাপতি ও চরফ্যাশনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পিআইও ওয়ালিউল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে জানা যাবে প্রকৃত ঘটনাটা কি। তখন সমাধান করা যাবে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রাস্তার বরাদ্দ অন্য স্থানে ব্যবহার করার পেছনে কার হাত রয়েছে এবং কার স্বার্থে এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হলো-চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এখন এটাই প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দারা অনতিবিলম্বে এই প্রকল্পের সব নথি পরীক্ষা করে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রাস্তাটি সংস্কারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
