Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

কুষ্টিয়ায় রাসায়নিক সারের বিকল্প কেঁচো কম্পোস্ট

ঘরে ঘরে জৈব সার কারখানা

Advertisement

Icon

এ এম জুবায়েদ রিপন, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

রাসায়নিক সারের সংকট ও বাড়তি দামের মধ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন উদ্যোগ। কৃষকের ঘরে ঘরে গড়ে উঠছে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরির ছোট ছোট কারখানা। গোবর, কেঁচো ও ফসলের অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি এ সার জমিতে প্রয়োগ করে ভালো ফলন পাওয়ায় বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ। বিশেষ করে নারীদের কাছে জৈব সার উৎপাদন হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের মাধ্যম। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বর্তমানে ৭ হাজার ৫১টি প্লান্টে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার। তবে রাসায়নিক সারের বিশাল চাহিদার তুলনায় এ উৎপাদন এখনো সীমিত, যা দিয়ে প্রতি বছর মোট চাহিদার প্রায় ৩ শতাংশ পূরণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

গোবর-কেঁচোতেই সারের জোগান : কুষ্টিয়ায় দুই ও তিন ফসলি জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেশি। সার সংকট ও বাড়তি দামে চাপে রয়েছেন কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসাবে নিজ বাড়িতেই জৈব সার উৎপাদন শুরু করেছেন অনেকে। গোবর, কেঁচো, খড়কুটো, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও পচনশীল উদ্ভিদজাত বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এ সার। সরেজমিন সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট প্লান্টে চলছে জৈব সার উৎপাদন। অনেক বাড়িতে ১০টি করে চাকে সার তৈরি করা হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, প্রতিটি বাড়িতে এসব চাক থেকে মাসে ১০ থেকে ১২ মন সার উৎপাদন করা যায়। কোথাও সরকারি উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরির প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্ট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে নিজ উদ্যোগেই উৎপাদনে নেমেছেন।

জমিতে ফলন, ঘরে বাড়তি আয় : সদর উপজেলার বিত্তিপাড়ার জৈব সার উৎপাদনকারী মনিরা জানান, জৈব সার ব্যবহারে ফসল ভালো হয়। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমানো যায়। তাদের গ্রামের মানুষ আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি চাষে যেমন এ সার কাজে লাগছে, তেমনি ধান, ভুট্টা, শসা ও অন্যান্য সবজির খেতেও ব্যবহার করছেন কৃষকরা।

উজানগ্রাম, আব্দালপুর ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে জৈব সার উৎপাদনে যুক্ত উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই নারী। বাড়ির কাজের পাশাপাশি তারা সার তৈরি করছেন। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পর বাড়তি সার বিক্রি করছেন। প্রতি কেজি সার ১৫ টাকা দরে বিক্রি করে বাড়তি আয় হচ্ছে তাদের। এসব গ্রাম থেকে অনেকে কেঁচোও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সার বিক্রি করে অনেক পরিবার মাসে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছে। এ অর্থ তারা সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলড্রেস তৈরি ও পরিবারের নানা প্রয়োজনে ব্যয় করেন। সার তৈরিতে তুলনামূলক কম পরিশ্রম হওয়ায় এ কাজে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে।

৭ হাজার ৫১ প্লান্টে উৎপাদন : কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৭ হাজার ৫১টি প্লান্টে জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত প্লান্ট ৪৬২টি। কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে উঠেছে আরও ৬ হাজার ৫৮৯টি প্লান্ট। সব মিলিয়ে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার। কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকের বাড়িতে জৈব সার উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণে নিয়মিত কাজ করছেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। অব্যবহৃত জৈব উপাদান কাজে লাগিয়ে সার তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনাও রয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, কৃষকের ঘরে ঘরে জৈব সার উৎপাদনে কৃষি বিভাগ নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার দলের সদস্যরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছি। তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

একজনের উদ্যোগ থেকে শুরু করে এখন বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। এটিকে বড় সাফল্য হিসাবে দেখছি আমি।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম : কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৩ হাজার টন এবং নন-ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৭ হাজার টন। বিপুল এ চাহিদার বিপরীতে জৈব সার উৎপাদনের পরিমাণ এখনো সীমিত। তবে পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়াই কৃষকদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় উৎপাদন বাড়তে থাকায় সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সরকারি সহায়তা পেলে কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং জৈব সার ব্যবহারের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।

প্রয়োজন পরিকল্পিত সরকারি সহায়তা : সংশ্লিষ্টদের মতে, কুষ্টিয়ার এ উদ্যোগ দেশের অন্য কৃষিপ্রধান এলাকাতেও জৈব সার উৎপাদনে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। তবে উৎপাদন টেকসই করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ এবং মানসম্মত সার বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা জরুরি। পাশাপাশি জৈব সারের পুষ্টিমান পরীক্ষা ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। গবেষক, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, কৃষকদের মধ্যে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারের আগ্রহ বাড়া ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও রাসায়নিক সারের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ অঞ্চলের কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জৈব সার উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

৫৮ বছরেও কাটেনি লিফটম্যান সংকট শেবাচিমে ১৫ লিফটের ৭টিই বন্ধ, ভোগান্তি

শেবাচিমে ১৫ লিফটের ৭টিই বন্ধ, ভোগান্তি

কুষ্টিয়ায় রাসায়নিক সারের বিকল্প কেঁচো কম্পোস্ট ঘরে ঘরে জৈব সার কারখানা

ঘরে ঘরে জৈব সার কারখানা

কুমিল্লার বুড়িচং সীমান্ত মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আ.লীগের হানুর সিন্ডিকেট

মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আ.লীগের হানুর সিন্ডিকেট

রাকসুর এক বছর ইশতেহারের ২৪ দফার কিছুই হয়নি

ইশতেহারের ২৪ দফার কিছুই হয়নি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম