গুম খুন ক্রসফায়ার কী করতেন না তিনি!
অবশেষে চাকরিচ্যুত আনিসুর
যশোর ব্যুরো
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খুন, গুম, ক্রসফায়ার, জঙ্গি সাজিয়ে হয়রানি, চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলায় ফাঁসায়ে ফায়দা হাসিল-কী করতেন না তিনি। তার দাপটে শুধু তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীই নন, তটস্থ থাকত সাধারণ মানুষও। তার টার্গেটই ছিল বিরোধী দল ও মতের মানুষকে বিভিন্নভাবে ফাঁসিয়ে সরকারের সন্তুষ্টি অর্জন এবং নিজের আখের গোছানো। এতে তিনি সফলও হয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ জেলা, স্টেশনে পদায়ন ও ডিআইজির পদও বাগিয়েছিলেন। সেই জোরে তার স্ত্রী ফাতেমাতুজ্জহুরা শ্যামলী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্যও হয়েছিলেন। এতে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বলছি যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) ও রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমানের কথা।
২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত যশোরে তিনি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। অপকর্মের কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘সন্ত্রাসী এসপি’ নামেও পরিচিত হয়েছিলেন। অবশেষে তাকে চাকরিচ্যুত করেছে সরকার। শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর লাপাত্তা ডিআইজি আনিসুর রহমান। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। তৎকালীন এসপি আনিসুরের শাস্তির দাবিতে অন্তত আটটি মামলা হয়েছে। খুন, গুম ও গুলি করে পঙ্গু করার অভিযোগে করা এসব মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ চলছে। অপরদিকে তার নির্দেশে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো পরিবারগুলো আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে।
ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে চারটি মামলা : এসপি আনিসুরের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের রেকর্ডসংখ্যক মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা ও পঙ্গু করার অভিযোগ রয়েছে। তার ভয়ে সেসময় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে।
মনিরামপুরের জয়পুরের আবু সাঈদকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাবেক এসপি আনিসুরসহ আটজনের নামে মামলা হয়েছে। ওই বছরের ২১ আগস্ট একই গ্রামের পল্লিচিকিৎসক বজলুর রহমান ও আনিসুর রহমানকে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এছাড়া মনিরামপুরের তাহেরপুরের ইউসুফ আলীকে ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনায় তিনিসহ আরও কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহীদ ইকবাল বলেন, চারটি মামলায় সাবেক এসপি আনিসুর রহমানসহ পুলিশ ও আ.লীগের নেতাকর্মীরা আসামি। এসব মামলার তদন্ত চলছে।
ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলি : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট যশোরের চৌগাছা থানা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে গুলি করে পুলিশ। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় সাবেক এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, বর্তমানে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করি।
তিনজনকে গুম : পিরোজপুরের সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল সাইদুর রহমান ও শাওন নামের দুই যুবককে যশোরের পৌর পার্ক থেকে তুলে নিয়ে গুম করে পুলিশ। এ ঘটনায় তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ ১০ জনের নামে মামলা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট বিএনপির কর্মী মাসুমকে যশোর শহরের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
জঙ্গি সাজিয়ে হয়রানি, ৯ বছর পর নির্দোষ : জঙ্গি দমনের নামে তৎকালীন এসপি আনিসুর নাটকীয় পরিবেশ তৈরি করতেন। এরপর অভিযানের নামে মিডিয়া ট্রায়ালে আটক দেখিয়ে মামলা দিতেন। এমন অভিযানে চারজনের পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। ৯ বছর পর জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজল।
২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন ডিবি হেফাজতে চোখ বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে জঙ্গি হিসাবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর মামলা থেকে খালাস দেন আদালত। এ বিষয়ে তার আইনজীবী মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, আসামিকে নির্দোষ প্রমাণের সব রকমের চেষ্টা করেছি। আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় খালাস পেয়েছেন।
প্রতিবাদ করায় মানবাধিকারকর্মীকেও মামলায় হয়রানি : এসপি আনিসের নির্দেশে রাতে যশোর শহরের গাড়িখানা রোডের ৪০টি পরিবারকে উচ্ছেদ ও লুটপাট করে পুলিশ। এর প্রতিবাদ করায় ২০১৭ সালে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিককে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার ছেলেকেও মাদকের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
এ বিষয়ে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, আনিস সন্ত্রাসী এসপি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তার নির্যাতনে কেউ রেহাই পাননি। যশোরকে পুলিশি ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করেছিলেন। তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জেলে গেছি। আমার ছেলেকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। তার দায়িত্বকালে যশোরে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে।
