রাজশাহীতে সক্রিয় ৩৫ কিশোর গ্যাং
নানা অপরাধে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি * পুলিশ বলছে তৎপর, তবে কমছে না চুরি-ছিনতাই হামলা-চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি-মাদক সেবন
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী নগরীর পাড়া-মহল্লার অলিগলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন মোড়, পার্ক, লেক ও ফ্লাইওভার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চুরি, ছিনতাই, সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি ও মাদককেন্দ্রিক নানা অপরাধে জড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এরা। কিশোর বয়সি সন্ত্রাসীরা স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে উত্ত্যক্ত করছে, বেপরোয়া মোটরবাইক রেস এবং দলবদ্ধভাবে মহড়া দিচ্ছে। এছাড়া সংঘবদ্ধভাবে চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়ছে। কেউ বাড়িঘর নির্মাণ অথবা ব্যবসা শুরু করলে কিশোর সন্ত্রাসীরা গিয়ে চাঁদা দাবি করছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কিশোর গ্যাংয়ের উপদ্রবে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়িয়েছেন তারা। ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই কিশোর অপরাধীরা সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের হিসাব মতে, নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৫টি। এসব গ্রুপের আনুমানিক সদস্য পাঁচ শতাধিক। এসব চক্রের মধ্যে-টেন স্টার বয়, রাইজিং বয়, অদম্য বালক, গলি বয়, হিটার বয়েজ, নেকসাস, মায়া, ফালতু, সিংহাম, প্ল্যাস্টিক, ডি-হটবয় ও বুলেট গ্যাংয়ের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রুপ এলাকা ও মহল্লাভিত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে নানা অপরাধ করছে। এসব অপরাধের মধ্যে চুরি যেমন আছে তেমনি ছিনতাই, ইভটিজিং, চাঁদাবাজিও রয়েছে। এদের অনেকেই তীব্রভাবে মাদকাসক্ত। চাঁদাবাজি করে এরা নিয়মিত বিরতিতে মহল্লায় পিকনিক করে। রাতভর ডেকসেট বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাস করে, মাদকসেবন করে।
লক্ষ্মীপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতে পাড়া-মহল্লায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব গ্রুপ প্রায়ই আরেক গ্রুপের সঙ্গে মারামারিতে জড়ায়। তারা নিজেদের চিহ্নিত করতে গ্রুপের নামে একই রকমের জার্সি পরে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। এরা সন্ধ্যা নামলেই দলবদ্ধভাবে মোটরবাইক নিয়ে দাবড়ে বেড়ায় এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লা। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এরা বিভিন্ন দোকান থেকে চাঁদাবাজি করে নগরীর বিভিন্ন উপকণ্ঠে মাদকের আস্তানায় ছুটে যায়। এসব গ্রুপকে একেক এলাকার একেকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাং সদস্যদের উপস্থিতি নজর কাড়ে সবার। আরএমপির সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, সার্কিট হাউজসংলগ্ন সিএন্ডবি মোড় সড়ক, বিমান চত্বর, পদ্মাপাড়, চিড়িয়াখানা, ভদ্রা পার্ক ও লেক এবং মেহেরচন্ডি ফ্লাইওভার এলাকাকে কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা ও অপরাধপ্রবণ হটস্পট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুই বছর আগে আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট নগরীতে সক্রিয় পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যের তথ্যভান্ডার তৈরি করেছিল। তবে কারও বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কতটা কার্যকর তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি মাছুমা মোস্তারী বলেন, যে কোনো ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অটুট আছে। মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরএমপির তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে আরও রয়েছে-পথচারী ও যানবাহন থামিয়ে মারধর, টাকা ছিনিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা। ৩ জুলাই শাহমখদুম থানা এলাকায় সিটিহাটগামী একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে চালককে মারধর ও তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে একটি কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযোগ হলে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। ১৯ মে কোর্ট একাডেমি স্কুল ছুটির সময় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে মারধর করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এ ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দুই কিশোরকে গ্রেফতার করে। একই সময়ে কাশিয়াডাঙ্গায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের দুপক্ষের সংঘর্ষ ঘটে। এর কয়েকদিন পর চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য সরকারি কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। ২৭ সেপ্টেম্বর নগরীর বাকির মোড়ে টাকা ভাঙানো নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে এক দোকানদারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আরএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার গাজীউর রহমান জানান, গত ছয় মাসে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১২ কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নগরীতে দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং না থাকলেও ছিঁচকে কিশোর গ্যাং সদস্যরা নানা অপরাধ করছে। এদের অন্যতম লক্ষ্য এলাকায় চাঁদাবাজি করা ও ক্ষেত্র বিশেষে মাদক সেবন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদেরও এরা উৎপাত করে। অশালীন আচরণও করা হয়। আরএমপির এই উপকমিশনার জানান, সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপ শনাক্ত করে নজরদারি করা হচ্ছে। অভিভাবকদের সন্তানদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোই পুলিশের মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আর অভিভাবকদের নিজের সন্তানদের বিষয়ে নজরদারি করতে হবে যাতে এরা বিপথগামী কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে না পড়ে।
