বগুড়ার ধাপ সুলতানগঞ্জ হাট
খাস আদায়ের নামে বেপরোয়া চাঁদাবাজি
Advertisement
তানভীর আলম, বগুড়া
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উত্তরাঞ্চলের পশু কেনাবেচার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বগুড়া দুপচাঁচিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধাপ সুলতানগঞ্জ হাট। সরকার প্রতিবছর এখান থেকে পায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। তবে হাটটি ঘিরে এবার প্রকাশ্যে এসেছে নজিরবিহীন অনিয়ম ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারসাজি। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলেও হাটের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির ধরনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। উলটো ‘খাস’ আদায়ের আড়ালে শুরু হয়েছে বেপরোয়া অর্থ বাণিজ্য। দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান করেও শিডিউল বর্জন করিয়ে হাটটি আনুষ্ঠানিক ইজারার বাইরে রাখা হয়েছে। আর এই সুযোগে ‘খাস কালেকশনের’ নামে সাধারণ ক্রেতা ও খামারিদের পকেট কেটে লুট করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ১৭ বছর ধরে ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের কবজায়। তবে চব্বিশের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও হাটের নিয়ন্ত্রক বলয় ভাঙেনি। অভিযোগ উঠেছে, আগের সেই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ-সদস্য, সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় কতিপয় বিএনপি নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার গোপন আঁতাত তৈরি হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাঈদ ফকিরের নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। তারা ৫৮ জনের গোপন সমঝোতা কমিটিও গড়ে তুলেছে।
রসিদে টাকার অঙ্ক নেই, চলছে প্রকাশ্যে ডাকাতি
সরেজমিন হাটে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের অসহায়ত্বের চিত্র। নিয়ম অনুযায়ী খাজনা আদায়ের রসিদে সরকার নির্ধারিত ফি উল্লেখ থাকার কথা থাকলেও তা লেখা হচ্ছে না। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই জোর করে বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
গরু কিনতে আসা সিরাজগঞ্জ কাজীপুর নাটুয়াপাড়া এলাকার সিদ্দিক ব্যাপারী বলেন, রসিদে শুধু গরুর দাম লেখা হচ্ছে, কিন্তু খাজনার কোনো অঙ্ক লেখা নেই। ৮০০ টাকা নিয়ে সাদা রসিদ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলে সিন্ডিকেটের লোকজনের হুমকি ও মারধরের শিকার হতে হয়। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের জামালগঞ্জের মিরাজুল ইসলাম বলেন, ছাগল-ভেড়ার ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে ৪০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ধাপের হাটের ভাইরাল মাংসের হোটেলের মালিক বাবলু বলেন, তিনটি রসিদ দিয়ে তার কাছে থেকে ৫০ টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া হাটের প্রবেশমুখে গরু ‘চেক’ করার নামে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং ফুটপাতের অস্থায়ী কাঁচাবাজার ও ছোট দোকানগুলো থেকেও দৈনিক ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে হাটের আদায়কারী মোহরী আব্দুল মান্নান, খোকন, সুলতান, মানিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা দায় এড়িয়ে জানান। তারা বলেন, ওপরের নির্দেশেই তারা শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার নাম ও পশুর বিবরণ লিখছেন, টাকার ঘর খালি রাখছেন বলে জানান।
এ বিষয়ে দুপচাঁচিয়া পৌরসভার বাজার পরিদর্শক নুরুন্নবী পোদ্দার বলেন, সরকারি হারেই খাজনার পরিমাণ নির্ধারিত। গরুর দাম লাখ টাকার ওপরে হলে খাজনা ৮০০ টাকা এবং লাখ টাকার নিচে হলে ৬০০ টাকা এবং ছাগল ২৫০ টাকা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
এই হাট সিন্ডিকেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আবু সাঈদ ফকির আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ করেছি কিন্তু কারও ক্ষতি করিনি। আমি ব্যবসা করে খাই। নওগাঁসহ আরও কয়েক জায়গায় চারটি হাট ইজারা নেওয়া আছে আমার। ইজারায় কেউ আগ্রহী না হওয়ায় আমি সরকারি ‘খাস কালেকশন’ করতে সহযোগিতা করছি।’
দুপচাঁচিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহরুখ খান বলেন, আমরা রসিদে অর্থের পরিমাণ লিখতে বলেছি। তারা না লিখলে ব্যক্তিগত সুবিধার্থে এই কাজ করা হচ্ছে।
বগুড়া-৩ আসনের সংসদ-সদস্য আবদুল মুহিত তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, গত কুরবানি ঈদের আগে ইউএনও আমাকে বুঝিয়েছিলেন, ইজারার টাকা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এখন হাট-ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এমপি বলেন, হাটের বিভিন্ন অনিয়ম সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আগামী বৃহস্পতিবার হাটে তিনি নিজে পরিদর্শনে যাবেন বলে জানান।
