সাইবার প্রোপাগান্ডা
অপতথ্যের বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সাম্প্রতিককালে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিকল্পিত অপতথ্য বা ন্যারেটিভ ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতীম হত্যার ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা, মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশারাত মঞ্জিল’ দাবি করা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ভিসা নিষেধাজ্ঞার অপপ্রচার-প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে, সমাজকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করতে কীভাবে সাইবার প্রোপাগান্ডাকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা এই তথ্যযুদ্ধের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, ঘটনার পরপরই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সক্রিয় না হওয়া। তারা থাকে দর্শকের ভূমিকায়। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিক সত্য প্রকাশ না করে ‘দেখি কী হয়’ নীতি অবলম্বন করে। ফলে সৃষ্ট তথ্যের শূন্যতা পূরণ করে অনুমান, গুজব ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। পরবর্তী সময়ে মূলধারার গণমাধ্যম বা টকশোতে আলোচনা শুরু হলেও ততক্ষণে অপতথ্য মানুষের মনোজগতে শেকড় গেড়ে বসে। অথচ শুরুতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ঘটনার প্রকৃত চিত্র, যাচাই করা তথ্য এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে অপতথ্য তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমে যেত। ডিজিটাল ফরেনসিক ও গুজব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যযুদ্ধে সরকারের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হলো দ্রুত ও সমন্বিত তথ্য সরবরাহের ঘাটতি।
গুজব ও প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হলো তথ্যভিত্তিক ও দ্রুত কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করা। রাজনৈতিক স্লোগান বা মানুষের কণ্ঠ রোধ করে নয়, বরং সত্য ও প্রমাণনির্ভর তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই এর মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রযুক্তি ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম গঠন করা জরুরি, যা ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থেকে ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করবে এবং ঘটনার সঠিক চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরবে। পাশাপাশি দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ টিমকে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।
স্বস্তির বিষয় হলো, অপতথ্য ও ডিজিটাল হয়রানি রোধে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা ঢাকায় অফিস স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ঢাকায় মেটার অফিস প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষে সরাসরি যোগাযোগ করে আপত্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করা অনেক সহজ হবে।
বস্তুত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রেখেই মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশনের বিস্তার রোধ করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে মিথ্যা তথ্য, ঘৃণা বা সহিংসতার উসকানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সময় এসেছে প্রথাগত নিষ্ক্রিয়তা ঝেড়ে ফেলে সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রো-অ্যাক্টিভ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত যোগাযোগ কৌশল গড়ে তোলার। তবেই দেশজুড়ে চলমান তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলা করে একটি স্থিতিশীল ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
