অনিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় নিশ্চিত করতে হবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। অপরাধীদের মধ্যে পুলিশবাহিনীকে ভয় না পাওয়ার প্রবণতা এবং কোনো কোনো মহলের আইনের তোয়াক্কা না করার অর্থাৎ ‘ড্যাম কেয়ার’ মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মিরপুরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পুলিশের গাড়িতে হামলা, রাড্ডা ম্যাটার্নাল সেন্টারে অতর্কিত ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে সশস্ত্র তাণ্ডবের মতো ঘটনা ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীকালে গঠিত নির্বাচিত সরকার পুলিশকে জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উভয়েই সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাঁড়াশি অভিযান, ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এতৎসত্ত্বেও ধারাবাহিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অপরাধীকে গ্রেফতার করে কিংবা রুটিন অভিযান চালিয়ে এ অস্থিতিশীলতা দূর করা সম্ভব নয়। অপরাধের শিকড় ধরে টান দিতে হবে এবং এর পেছনে থাকা অদৃশ্য মদদদাতা বা প্রভাবশালী চক্রগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে।
অতীতে আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অপরাধীদের যে মনস্তাত্ত্বিক ভয় কাজ করত, বর্তমানে তা অনেকাংশে অনুপস্থিত। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে, যা জনমনে সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কাজেই অপরাধীদের মনে এমন দৃঢ় ধারণা তৈরি হওয়া জরুরি যে, অপরাধ করে কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না। শাস্তির অনিশ্চয়তা অপরাধপ্রবণতা বাড়ায়, আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ অপরাধীর মনে জবাবদিহি বোধ তৈরি করে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অপরাধী প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান হওয়ার কারণে আইনের আওতার বাইরে থাকবে-এমন ধারণা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। তাই অপরাধীর পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইনের বিধান অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ভয় মানে নিপীড়নের ভয় নয়; বরং অপরাধ করলে নিশ্চিতভাবে আইনি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে-এই বিশ্বাসই কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করে। ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগই পারে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে।
দেশে সার্বিকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশবাহিনীর মনোবল পুনর্গঠন এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করার বিকল্প নেই। অন্যথায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এ লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়তে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
