অধরা কিশোর গ্যাং
নেপথ্য আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করা জরুরি
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন দৌরাত্ম্য এবং সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নগরবাসীর জন্য গভীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ-কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে গত দেড় মাসে দেড় হাজারের বেশি সদস্য গ্রেফতার হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের তৎপরতা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দির চাপে দেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো এখন সংকটে পড়েছে। গাজীপুরের টঙ্গী এবং যশোরের পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি শিশু-কিশোর অবস্থান করায় সেখানে স্বাভাবিক পরিবেশ ও সংশোধনের সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, মাদকের অবাধ বিস্তার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ প্রশ্রয় বন্ধ না করে শুধু বলপ্রয়োগ ও গ্রেফতার অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নিরাময় করা প্রায় অসম্ভব।
দেশের গ্যাং সংস্কৃতির পেছনের মূল চালিকাশক্তি হলো কিছু সুবিধাবাদী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। মিছিলে লোক বাড়ানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এলাকাভিত্তিক কিশোরদের প্ররোচিত করে গ্যাং গড়ে তোলা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বস্তিকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পারিবারিক তত্ত্বাবধানের অভাবে সুবিধাবঞ্চিত কিশোররা টিকটক বা ফেসবুকের অপব্যবহারের মাধ্যমে কিংবা হুজুগে পড়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। দুর্ভাগ্যবশত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঠপর্যায়ের কিশোর অপরাধীরা ধরা পড়লেও নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী আশ্রয়দাতারা সবসময়ই আইনের আওতার বাইরে থেকে যান। এই নেপথ্য আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে শুধু সাধারণ কিশোরদের গ্রেফতার করে সংকট কাটানো যাবে না।
অন্যদিকে, প্রচলিত আইন ও সংশোধন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বিদ্যমান আইনে ১৮ বছরের কম বয়সি সবাই শিশু হিসাবে গণ্য হওয়ায় মারাত্মক অপরাধে জড়িত থাকা সত্ত্বেও তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে। আবার সংশোধনাগারগুলোতে পর্যাপ্ত মানসিক কাউন্সেলিং, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব থাকায় অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে নতুন করে আরও বড় ধরনের অপরাধমূলক চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। এটি প্রমাণ করে, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোকে কেবল বন্দিশালা না বানিয়ে সেগুলোকে প্রকৃত অর্থে চরিত্র গঠনের কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া জরুরি।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তান কোথায় সময় কাটাচ্ছে, কার সঙ্গে মেলামেশা করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ধরনের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে, তা তদারকি করার প্রাথমিক দায়িত্ব পরিবারের। এছাড়া প্রান্তিক পরিবারের কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশি ধরপাকড়কে সমাধানের একমাত্র পথ না বানিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদানের অবসান, মাদকের উৎস বন্ধ এবং কার্যকর সামাজিক পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন। সমন্বিত প্রশাসনিক ও পারিবারিক উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল কিশোরদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
