ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা
Advertisement
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘটনাটি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর ভাবনার খোরাক জোগায়। মাদকবিরোধী অভিযানে নিজের লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে উঁচিয়ে বিতর্কে জড়ানোর পর সোমবার তিনি সংবাদ সম্মেলন ডেকে পদত্যাগের কথা জানান। ইশরাক দাবি করেছেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে না যায়, সেজন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজ এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে একজন জনপ্রতিনিধির উদ্বেগ ও তাড়না অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রশংসনীয়। তবে সেই তাগিদ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা প্রকাশ্য স্থানে অস্ত্র প্রদর্শন করার মাধ্যমে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সংবেদনশীলতার দিক থেকে কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের এ সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, সামাজিক কল্যাণ অর্জনের লক্ষ্য যতই মহৎ হোক না কেন, তা অর্জনের পথ ও প্রক্রিয়াও হতে হবে সম্পূর্ণ আইনানুগ, মার্জিত ও সুশৃঙ্খল।
মাদকের ভয়াবহ থাবা আমাদের তরুণ সমাজ ও অনেক পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যা যে কোনো সচেতন নাগরিকের মতোই একজন জনপ্রতিনিধিকেও উদ্বেলিত করতে পারে। কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলায় আবেগ বা ব্যক্তিগত উদ্যোগের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ের ওপর ভরসা রাখাই যে শ্রেয়, তা বলাই বাহুল্য। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির আচরণ সাধারণ মানুষের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সেদিক থেকে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিয়ে অভিযানে নেমে পড়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিকে ছাপিয়ে নিজে আইন প্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সমাজের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ ও ভীতির সৃষ্টি করে। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়।
অভিযান পরিচালনার প্রেক্ষাপট ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ইশরাক হোসেন যে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও অনুশোচনার একটি রূপ প্রকাশ করে। তবে সমাজকে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল খুচরা বিক্রেতা বা স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; মূল সমস্যাটি যেখানে লুকিয়ে আছে-অর্থাৎ মাদকের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরবরাহকারীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে রাষ্ট্রীয় আইনের পূর্ণ প্রয়োগ ঘটিয়ে। মনে রাখতে হবে, জনপ্রতিনিধিদের কাজ হলো নীতিনির্ধারণে সহায়তা করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে উপযুক্ত সংস্থান জোগানো এবং জনগণের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা-সরাসরি বিচারকের ভূমিকা নেওয়া নয়।
আমরা মনে করি, এ ঘটনাটি আমাদের সব স্তরের জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। সেটি হচ্ছে, ক্ষমতা বা পদের মর্যাদা কখনো আইনের চেয়ে বড় হতে পারে না, বরং যত বড় পদ-দায়িত্বশীলতা ও পরিমিতিবোধের প্রত্যাশাও তত বেশি। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে নিজেদের কাজের সীমানা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হওয়াই হবে প্রকৃত উত্তরণের পথ। আমরা বিশ্বাস করি, একটি সভ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে কঠোর প্রশাসনিক অনুশাসনের পাশাপাশি গভীর নীতি-নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং আইনের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধাবোধকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
