বিনিয়োগ সংকটে স্থবির অর্থনীতি
অচলাবস্থা ভাঙতে চাই দূরদর্শী রূপরেখা
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আস্থার সংকট ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে দেশের অর্থনীতি। সোমবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বিনিয়োগ এখন এক বন্ধ্যত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা কেবল নতুন শিল্প খাতের বিকাশকেই থমকে দেয়নি, নতুন কর্মসংস্থানের পথও স্থবির করে ফেলেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে তীব্র ধস, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির করুণ দশা এবং বিদ্যমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি নাজুক।
বলা বাহুল্য, শুধু ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য কিংবা অলস টাকা জমা থাকাই কোনো দেশের অর্থনীতির গতিশীলতার লক্ষণ হতে পারে না। উদ্যোক্তারা যখন সেই মূলধন ব্যবহার করে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে ভয় পান, তখন বুঝতে হবে সংকটের শিকড় গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা মনে করি, নিরবচ্ছিন্ন স্থবিরতার নেপথ্যে থাকা বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো জরুরি ভিত্তিতে কাটিয়ে ওঠাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং উচ্চ সুদের হার নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এমনকি ঘোষিত সরকারি সুবিধা ও ঋণ সহায়তা কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকে থাকায় প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে তা পৌঁছাতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলো যখন অভূতপূর্ব গতিতে নতুন ইক্যুইটি মূলধন ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, তখন বাংলাদেশে বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ হলেও নতুন বিদেশি পুঁজি আসার হার হতাশাজনক। এটা পরিষ্কার যে, বৈশ্বিক ও দেশীয় নানা সূচকে কাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতিসহ পুরোনো ব্যাধিগুলো বিদেশি উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন বজায় থাকলে শিল্প ও সেবা খাতই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্জিত আয় কমে পুরো অর্থনীতি এক গভীর ফাঁদে আটকা পড়তে পারে।
বিদ্যমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারকে শুধু আশ্বাস বা আশাবাদের কথা না বলে বাস্তবে বলিষ্ঠ ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, শিল্প খাতের চাকা পুরোপুরি সচল রাখতে এবং উৎপাদন খরচ কমানোর স্বার্থে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ঋণের উচ্চ সুদহারের চাপ কমিয়ে আনাসহ ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ উদ্যোক্তাদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনাও অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তা বিদ্যমান প্রতিকূলতার মধ্যেও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করছেন, তাদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যবসা পরিচালনার পারিপার্শ্বিক খরচ কমানো, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং প্রতিটি খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপও আস্থার সংকট দূর করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে অর্থনীতি পরিচালনায় দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।
