তিন টাকার মাছে ৪৫ টাকার খরচ
উন্নয়ন প্রকল্প নাকি লুটপাটের মচ্ছব
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি প্রকল্পের নামে মেগা খরচের যে মচ্ছব চলছে, ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প যেন তারই এক দলিল। যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার ২৯টি বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা যে কোনো সচেতন নাগরিককে চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাঁওড়ে মাছের পোনা অবমুক্ত করা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, ৩ কোটি টাকার পোনা বাঁওড়ে ছাড়তে অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা! অর্থাৎ মূল কাজের পেছনে ব্যয় হবে মোট বরাদ্দের মাত্র ৬ শতাংশ, আর বাকি ৯৪ শতাংশ অর্থই গিলে খাবে অন্যান্য অদরকারি খাত। এক টাকার পোনা ছাড়তে যদি ১৫ টাকা প্রশাসনিক খরচ করতে হয়, তবে এমন জনস্বার্থবিরোধী উন্নয়ন প্রকল্পের যৌক্তিকতা কোথায়?
প্রকল্পের খরচের খতিয়ান দেখলে চোখ কপালে ওঠে। চারটি কম্পিউটারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ লাখ টাকা-অর্থাৎ প্রতিটির দাম দুই লাখ টাকা! এছাড়া এসি ও ফটোকপি মেশিন কেনা, বিলাসবহুল অফিস ভাড়া এবং সভা-সেমিনারের নামে অবাধ খরচের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাঁওড়ে বার্ষিক উৎপাদন কত, ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত কত টাকার মাছ মিলবে কিংবা এই পোনা কেনার পর তাদের বেঁচে থাকা কীভাবে তদারকি করা হবে-তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ডিপিপিতে নেই। অথচ টেবিল-চেয়ার আর এসি-কম্পিউটার কেনার তোড়জোড় ষোলো আনা। মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক আরাম-আয়েশ ও ফালতু কেনাকাটাই যেন এখানে প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
আমাদের দেশে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে লুটপাট নতুন কোনো ঘটনা নয়। পরিকল্পনা কমিশন এই অস্বাভাবিক খরচে আপত্তি জানালেও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা হতাশাজনক। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ‘ডিপিপি না দেখে মন্তব্য করব না’ কিংবা ফোন বন্ধ রেখে এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিই প্রমাণ করে এই প্রকল্পের পেছনে জবাবদিহির কতটা অভাব রয়েছে। এডিপিতে বরাদ্দবিহীন এ প্রকল্পটি অনুমোদনের আগেই যে লুটপাটের ছক কষা হয়েছে, তা কঠোর হাতে দমন করা দরকার। প্রকল্প পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করে পোনা কেনা ও প্রযুক্তিগত তদারকিতে নজর দেওয়া উচিত। অপচয়মূলক ও লুটপাটমুখী এই প্রকল্প প্রস্তাবনা পুরোপুরি সংশোধনের জোর দাবি জানাচ্ছি।
