সড়ক দুর্ঘটনা কি আমাদের নিয়তি
এভাবে চলতে দেওয়া যায় না
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। নানা উদ্যোগ, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং সংবাদপত্রে লেখালেখির পরও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। প্রতিটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন, আর্থিক সহায়তার ঘোষণা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আমরা ভুলে যাই সবকিছু। একই অব্যবস্থাপনা, একই অনিয়ম আর একই দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রশ্ন হচ্ছে, সড়কে এভাবে মানুষের প্রাণহানি কি আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে? এ থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই?
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় মঙ্গলবার যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনেছে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাসযাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, চালক ঘুমিয়ে পড়ায় বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেন সুপারভাইজার। একপর্যায়ে বাসটি বিপরীত লেনে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি এবং চালকের ক্লান্তির অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; অবহেলা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতাই এই পরিণতি ডেকে এনেছে। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর এই বড়াইগ্রামেই ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই শোকাবহ ঘটনার ১২ বছর পূর্তির দিনেই আবারও একই জনপদে এত মানুষের মৃত্যু ঘটল। এত বছরেও যদি সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে আমাদের উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ চালকের অদক্ষতা ও ক্লান্তি, অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা। দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানো চালকের একাগ্রতা কমিয়ে দেয়। অথচ পরিবহণ খাতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপ, অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা এবং মালিকপক্ষের মুনাফাকেন্দ্রিক মনোভাব চালকদের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মহাসড়কে দুর্বল নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতি। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জীবন হয়ে ওঠে অনিরাপদ।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রথমেই প্রয়োজন আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। চালকের বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লান্ত চালক দিয়ে গাড়ি চালানো এবং অনুমোদিত আসনের অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মহাসড়কে যানবাহনের গতিসীমা বেঁধে দিয়ে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। লেন শৃঙ্খলা ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বাস ও ট্রাকের ফিটনেস পরীক্ষা করতে হবে নিয়মিত।
দুর্ঘটনার তদন্ত যেন দায় এড়ানোর আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয়। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানসহ সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। পরিবহণ মালিক, চালক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ-কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সড়কের বিপজ্জনক বাঁক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাও চিহ্নিত করে সংশোধন করা জরুরি। সবাইকে অনুধাবন করতে হবে, প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অসংখ্য সম্ভাবনার অবসান ঘটে। তাই শোক প্রকাশ কিংবা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা নয়, প্রয়োজন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা। সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি হিসাবে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
