স্থানীয় সরকারে দুর্নীতির থাবা
জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থানীয় সরকার খাতে গত সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী আমল এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময়কালের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র নিয়ে সম্প্রতি যে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে শিকড় গেড়ে বসা সুশাসনের ঘাটতিকেই উন্মোচন করেছে। মঙ্গলবার যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গঠিত কমিটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে। বলা বাহুল্য, এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিহীনতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং লুণ্ঠনমূলক সংস্কৃতির এক ভয়াবহ দলিল।
এলজিইডি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা ওয়াসার মতো জনসেবামূলক ও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল, এর বিশদ ও চাঞ্চল্যকর বিবরণ রয়েছে এই প্রতিবেদনে। পিরোজপুরে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা নয়ছয়, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে সংগৃহীত ভ্যাট ও কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই না করেই ঠিকাদারি বিল পরিশোধ, বাজার ও মার্কেট ভাড়ার শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রভাবে বিশেষ বরাদ্দ বিতরণের চিত্র প্রমাণ করে জনগণের করের কষ্টার্জিত অর্থ কতটা নির্মমভাবে তছরুপ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী, সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, ওয়াসার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের বিলম্বজনিত জরিমানা মওকুফের নামে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার অনিয়ম এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা প্রমাণ করে দুর্নীতির জাল কতটা গভীরে বিস্তৃত ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্নীতি ও অনিয়মের এই মহোৎসবে আওয়ামী লীগ আমলের বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার কিছু অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগসহ সাম্প্রতিক মেয়াদের বিভিন্ন প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের বিষয়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তনই সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে কাঠামোগত ও নৈতিক আমূল সংস্কার।
এ বাস্তবতায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক বা অন্য যে কোনো প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করতে হবে। পিরোজপুরের এলজিইডি প্রকল্প, সিটি করপোরেশনগুলোর রাজস্ব লুণ্ঠন, ওয়াসার অনিয়ম এবং অন্যসব আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি কেনাকাটা, বিশেষ বরাদ্দ বণ্টন, ভ্যাট-কর আদায় এবং অডিট ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ফাঁকফোকরগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতিটি পয়সা যেন প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে-এটাই প্রত্যাশা।
