সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত
ঝিনাইগাতীর ইউএনও ওসি প্রত্যাহার
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শেরপুরে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা নিহতের ঘটনায় ঝিনাইগাতীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হাসানকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি বলেন, শেরপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। নির্বাচনি আচরণবিধিতে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ইশতেহার পাঠ ও প্রচারের কথা বলা হলেও সেখানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছ থেকে এ ঘটনার বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ঝিনাইগাতীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করার কথা জানানো হয়। বুধবার বিকালে শেরপুর-৩ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন।
অশ্রুভেজা নয়নে বিদায় মাওলানা রেজাউল করিমকে : মাওলানা রেজাউল করিমকে ধর্মীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়েছে। শ্রীবরদীতে দুই দফা জানাজা শেষে বৃহস্পতিবার রাতে গোপাল খিলা তার নিজ গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
বিকালে যখন মাওলানা রেজাউল করিমের লাশ বহন করে অ্যাম্বুলেন্সটি শ্রীবরদী কলেজ মাঠে পৌঁছে তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তাকে শেষবারের মতো দেখতে হাজারও মানুষ ভিড় জমান। লাশের পাশে পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ওই এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কলেজ মাঠে বিকাল ৫টায় অনুষ্ঠিত প্রথম জানাজায় নিজ দল ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সাধারণ মুসল্লিদের ঢল নামে।
এরপর রাত সাড়ে ৮টায় নিজ গ্রাম গোপালখিলা খেলার মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার লাশ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিকালে শ্রীবরদী উপজেলা শহরে জামায়াত ইসলামীর কার্যালয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তারা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেন।
বাবার কাঁধে ছেলের লাশ : মাওলানা রেজাউল করিমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বৃহস্পতিবার রেজাউলের বৃদ্ধ বাবা মাওলানা আব্দুল আজিজ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু ছেলের লাশ কাঁধে নেওয়ার অপেক্ষায়। বাড়ির উঠানের পাশেই চলছে ছেলের কবর খোঁড়ার কাজ। তাই নির্বাক দৃষ্টিতে ছেলের কবরের দিকে তাকিয়ে আছেন বাবা। রাতভর কান্না করে তার চোখের জল যেন শুকিয়ে গেছে। কান্নার রোল চলছে গ্রামের বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও।
চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন : জামায়াত নেতা রেজাউল করিম হত্যার ঘটনায় শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বুধবার রাতেই জামায়াত নেতা নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে শেরপুর জেলা শহর এবং শ্রীবরদী উপজেলাতে জামায়াত নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাতেই বের করেন বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশ করেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে।
বৃহস্পতিবার রেজাউল করিমের লাশ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্টমর্টেম করা হয়। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মাহমুদুর রহমান জানান, বৃহস্পতিার থেকে ওই দুই উপজেলায় চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে তৎপর থাকবে। তিনি আরও বলেন, ওই আসনের বিএনপি এবং জামায়াতের দুই প্রার্থীর সঙ্গে কথা হয়েছে তারাও চাচ্ছেন শান্ত পরিবেশ রাখতে এবং আগামী ২ দিন নির্বাচনি প্রচার না করার জন্য আহ্বান করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
জামায়াত নেতার মৃত্যুর ঘটনায় বিএনপি প্রার্থীর শোক : শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপির সংসদ-সদস্য প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারের আয়োজনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে জামায়াতের নেতাকর্মীরা আগে থেকেই সব চেয়ার দখল করে বসে ছিলেন।
আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই আমাদের কিছু কর্মীর সঙ্গে চেয়ারে বসা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যা খুবই দুঃখজনক। তবে আমি চাই পরিবেশ দ্রুত শান্ত হোক এবং এ বিষয়ে আমার যা করার তা করা হবে। জেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা আব্দুল বাতেন বলেন, আমাদের নেতার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত।
বিএনপির প্রার্থী রুবেলের নির্দেশে জামায়াত নেতা হত্যা : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, বিএনপির এমপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের উসকানি ও সরাসরি নির্দেশে শেরপুরে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে বিএনপির সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই জামায়াত ও ১১ দলীয় প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, শেরপুরে কর্তব্যরত ইউএনও এবং পুলিশ প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নীরবতা পালন করেছে। এতে প্রমাণিত হয় প্রশাসন একদিকে হেলে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু থাকবে না এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জুবায়ের বলেন, বুধবার দুপুর আড়াইটায় ঝিনাইগাতী স্টেডিয়াম মাঠে শেরপুর-৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কমকর্তার উদ্যোগে সব প্রার্থীর ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল। যথারীতি জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল নেতাকর্মীদের নিয়ে যথাসময়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন।
বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলসহ তার সমর্থক-কর্মীরা অনেক বিলম্বে আসেন। তখন বিএনপি নেতারা ইউএনওকে অর্ধেক অর্ধেক আসন ভাগ করে দিতে বলেন। ইউএনও জামায়াত প্রার্থীকে অনুরোধ করেন কিছু চেয়ার ছেড়ে দিতে। চেয়ার ছেড়ে দেওয়ার পরও বিএনপির প্রার্থী মাহবুবুল হক রুবেল, বিএনপি নেতা আব্দুর হান্নানসহ বিএনপির উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মী অব্যাহত উসকানি দিতে থাকে এবং হাতাহাতি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, এলডিপির এইচএম নূরে আলম, খেলাফত মজলিসের আবদুল আজিজ খসরু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) এইচএম জিয়াউল আনোয়ার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির শহিদুল আলম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুর রহমান, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান উপস্থিত ছিলেন।
‘জামায়াত কেন সব চেয়ার দখলে রেখে লাঠিসোঁটা জড়ো করল’ : শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এ সংঘাত এড়ানো যেত কিনা, নির্ধারিত সময়ের আগে একটি দল কেন সব চেয়ার দখল করে রাখল? সেই দলের লোকজন কেন সেখানে লাঠিসোঁটা জড়ো করল? সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে সেই দলের প্রার্থী কেন সংঘাতের পথ বেছে নিলেন, এসব বিষয় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘শেরপুরে বুধবার স্থানীয় প্রশাসনের আয়োজনে সব প্রার্থীর অংশগ্রহণে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে প্রতিটি দলের বসার জন্য আসন নির্ধারিত ছিল। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সব আসন, তথা চেয়ার দখল করে রেখেছিলেন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের তাদের নির্ধারিত আসনে বসতে দিচ্ছিলেন না। প্রশাসন বারবার আহ্বান জানানোর পরেও তারা চেয়ার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। চেয়ারে বসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেরপুরে যে সহিংসতা ও সংঘাত আমরা দেখেছি, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শেরপুরে ঘটনাটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করে মাহাদী আমিন বলেন, কীভাবে সেটি শুরু হলো, কারা সেখানে মদদ দিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন কেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারল না, এসব বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন জাগছে। এই সংঘাতে একজন মানুষ নিহত হয়েছেন, তিনি যে দলেরই হন না কেন তা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন শেরপুর ও নালিতাবাড়ী প্রতিনিধি।
