Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

তিন কারণে ভরাডুবি

ট্রাম্পের ট্রাম্প কার্ড হাতছাড়া

Icon

তুহিন তৌহিদ

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের ট্রাম্প কার্ড হাতছাড়া

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। কী কারণে তিনি এভাবে হারলেন-তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে কমপক্ষে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হলেও বিশ্লেষকরা তিনটির ওপর জোর দিচ্ছেন।

প্রথমত-জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মার্কিনিরা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ; দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের উসকানিতে ইরান যুদ্ধে জড়ানোয় তাদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ এবং তৃতীয়ত, ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসা ট্রাম্পের অপ্রকৃতস্থ আচরণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাটতি।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর একদিকে যেমন ডেমোক্র্যাটরা উল্লসিত, অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবিরে শুরু হয় কার্যত গৃহযুদ্ধ। নজিরবিহীনভাবে দলটির নেতারা একে অপরকে দোষারূপ করে চলেছেন। সবাই বলছেন- ইরান যুদ্ধে জড়ানোর কারণে এমন হার হয়েছে তাদের।

তবে এমন সমালোচনা শুরুর আগে খোদ ট্রাম্পই বলে বসেন-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তারা হেরে গেছেন। পরে তার প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টও জে ডি ভ্যান্সও একই কথা বলেন। তিনি বলেছেন, চলমান যুদ্ধ এ ব্যর্থতার জন্য ‘নিশ্চিতভাবে দায়ী’। এ প্রেক্ষাপটে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ইরান যুদ্ধে ভূমিকার কারণে শেষ পর্যন্ত পতন হতে পারে হেগসেথের। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকে সমর্থন দিচ্ছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধোপে না-ও টিকতে পারে। ট্রাম্পবিরোধী থমাস ম্যাসিসহ বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান হেগসেথের সরাসরি সমালোচনা করেন।

ভোটে এমন হার মেনে নিতে পারছেন না অনেক রিপাবলিকান নেতা। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসান্টিস বলেন, রিপাবলিকানদের জন্য যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অনেকটা ‘অস্তিত্ব বিলুপ্তর মতো ঘটনার কাছাকাছি’। কার্যত ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর অযুহাতে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। উলটো নিজেই এখন ব্যাপক পরিবর্তন দেখছেন। দলের ভেতর ও বাইরে থেকে সমালোচনা আসছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটা ‘রেজিম চেঞ্জে’র চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মূলত ব্যালটের মাধ্যমে মার্কিনিরা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেইসঙ্গে ইসরাইলকে নিঃশর্ত সমর্থনকেও তারা বাতিল ঘোষণা করেছেন।

তাহলে কি ট্রাম্প তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার আগে অভিশংসনের মুখে পড়তে পারেন? সম্ভবত ডেমোক্র্যাটরা এ সুযোগ দেবে না রিপাবলিকানদের। যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষতি ট্রাম্প প্রশাসন করেছে, তা পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগ তারা না-ও পেতে পারে। এ সুবিধা ডেমোক্র্যাটরা ২০২৮ সালের ৭ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কাজে লাগাতে চাইবে।

সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ধারার উত্থান : সদ্য শেষ মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন মুল্লুকে ডেমোক্র্যাট পার্টির সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ধারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। দলের নেতা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ ধারাকে আরও জনপ্রিয় করায় বড় ভূমিকা রেখেছেন।

এ কারণে বিশ্লেষদের অনেকে এ বিজয়ের জন্য স্যান্ডার্ডকে কৃতিত্ব দেন। নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলেও জয় পায়নি রিপাবলিকানরা। অর্থ ও জনগণ-এ দুটির মধ্যে মার্কিন জনগণই জিতলেন। ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে হামলার প্রতিবাদও উঠে এসেছে এ ভোটে। যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি লবির চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে কাজ দেয়নি।

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। তিনি চান-এআই যেন লাগামহীনভাবেই এগিয়ে চলে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ মনোভাবেরও বিরোধিতা দেখা গেছে। ভোটে ওয়াল স্ট্রিট থেকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে; ইলন মাস্কের মতো ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি ডলার অর্থ ঢেলে সুফল পাননি।

মার্কিন কংগ্রেস-অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে আগামী ৩ জানুয়ারি থেকে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী দুই মাস রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে কংগ্রেস। কোনো বিল পাশ করাতে ট্রাম্পকে যেহেতু কংগ্রেসের দ্বারস্থ হতে হয়, সেহেতু ডেমোক্র্যাটরা জিতলে সেখানে বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি।

আবার কংগ্রেসকেও অবশ্যই ট্রাম্পের সই পেতে তার দ্বারস্থ হতে হবে। এ কারণে পুরো ব্যবস্থাটি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, যা গত দুই বছর ধরে একতরফা চলে আসছিল। ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই অনেকটা গৌণ হয়ে পড়েছিলেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মকে তদন্তের মুখে ফেলবে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এখন তদন্তের মুখে পড়বেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের হাতে বেশ কিছু নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। তিনি মন্ত্রিসভা ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর কিছু আদেশ জারি করতে পারেন। সবচেয়ে বড় ক্ষমতাটি হলো-তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; তার নির্দেশে সামরিক বাহিনীতে সবকিছু ঘটে। এ অবস্থায় দেখার বিষয় তিনি ইরানে আবার হামলা শুরু করেন কিনা। অপ্রত্যাশিত আচরণ ও বেপরোয়া ট্রাম্প যে ইরানে ফের হামলা চালাবেন না-এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে-নিজ দেশের জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে কি তিনি ইরানে বড় হামলা চালাবেন? মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণ কার্যত ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধেই রায় দিয়েছেন।

তারা বার্তা দিয়েছেন-ইরানের সঙ্গে তারা যুদ্ধ চাইছেন না। কারণ এ যুদ্ধ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে; মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়েছে। তাই নির্বাচনটি ছিল ট্রাম্পের দুই বছরের কর্মকাণ্ডের জনরায়, যেখানে কার্যত তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

নির্বাহী ক্ষমতা এবং আরও দুই মাস রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ট্রাম্প চাইলেই আবার ইরানে হামলা শুরু করতে পারেন। কিন্তু ভোটের মাধ্যমে এ হামলার নৈতিকভিত্তি একেবারেই শেষ হয়ে গেছে। ইরানে ফের হামলা চালানোর বিরুদ্ধেই ভোট দিয়েছেন মার্কিনিরা।

এক্সিয়সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে ফের হামলা শুরুর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন। কারণ, ইসরাইলে নেতানিয়াহুও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। সেখানে ইসরাইলের মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ কারণে যুদ্ধের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান নেতানিয়াহু।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে তখন যুদ্ধকালীন জাতীয় সরকার গঠন করা হবে, যেখানে নেতানিয়াহু থাকবেন প্রধান। আর এভাবে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকবেন। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা আবার চালু হবে। ফলে কারাগারেও যেতে হতে পারে।

বিপদে নেতানিয়াহু : ইসরাইলের ভোটে নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের ক্ষমতায় লাগাম পড়ার কারণে নেতানিয়াহুও বিপদে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

আল জাজিরা জানায়, ইসরাইলের বিরোধী নেতা গ্যাদি আইজেনকোট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ‘পুনরায় ঠিক করা’র বিষয়ে ইসরাইলিদের আশ্বস্ত করছেন। সেখানে আইজেনকোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়ছে।

মার্কিনিরা পরিবর্তন চান : ভ্যান্স : যুক্তরাষ্ট্রে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব হতে পারে সুদূর প্রসারী। এ ফলাফল বদলে দিতে পারে অনেক কিছুই। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের এক মন্তব্য থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ভোটের পর বুধবার এক্স-এ ভ্যান্স বলেছেন-ফলাফল থেকে এটা প্রমাণ হয় যে, মার্কিন ভোটাররা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিবর্তন চান।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালে তাকে সমর্থন করা অনেক ভোটার ২০২৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। টাইমস অব ইসরাইল জানায়, ভ্যান্স ভোটারদের উদ্বেগের চার কারণ চিহ্নিত করেন-ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে হবে; জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে হবে; যুক্তরাষ্ট্র প্রথম নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে ও ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিবর্তন আনতে হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ছক কষে পোশাক খাতে অস্থিরতা

ছক কষে পোশাক খাতে অস্থিরতা

বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের নতুন মজুরি দুই মাসের মধ্যে

শ্রমিকদের নতুন মজুরি দুই মাসের মধ্যে

বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে ব্যর্থ বিপিসি কোটি সিলিন্ডার অলস দাম চড়ছে এলপিজির

কোটি সিলিন্ডার অলস দাম চড়ছে এলপিজির

তিন কারণে ভরাডুবি ট্রাম্পের ট্রাম্প কার্ড হাতছাড়া

ট্রাম্পের ট্রাম্প কার্ড হাতছাড়া

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম