ভারত থেকে জ্বালানি আমদানিতে জোর
ইতিবাচক সাড়া দিল্লির
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। যদিও উল্লিখিত জ্বালানি তেলের পরিমাণ চুক্তির চেয়ে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন বেশি। জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সঙ্গে আলোচনা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ওই আলোচনায় ভারতের হাইকমিশনারও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এদিকে বুধবারও ভারতীয় হাইকমিশনার জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল চাওয়া হয়। পরে এ বিষয়ে হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা জানান, বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে যে সহযোগিতা চেয়েছে, তা তার সরকারকে জানানো হবে। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জ্বালানি সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। আমরা তা গ্রহণ করেছি এবং দ্রুত ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশে তেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। বিকল্প উৎস হিসাবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। মার্চে কোনো সরবরাহ সংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।
সূত্রমতে, সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার। ওই আলোচনায় জ্বালানি তেলের বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। সেখানে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল), ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিমাসে চারটি পার্সেল (প্রতিটি ৫ হাজার মেট্রিক টন) করে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।
ওই বৈঠকের পর বেশকিছু অগ্রগতিও হয়েছে। উল্লিখিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রেলহেড ডিপোতে পৌঁছেছে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। ১০ মার্চ বিকাল থেকে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ শুরু হয়ে বুধবার তা সম্পন্ন হয়। পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোর তত্ত্বাবধায়ক মো. আহসান হাবিব চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে জানুয়ারিতে একটি পার্সেলে আরও ৫ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহ করেছে ভারত। জানা যায়, জ্বালানি তেল আমদানির লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করে। এ চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের কথা। এর মধ্যে ফার্ম পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন এবং চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬০ হাজার মেট্রিক টন আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৯০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আসার কথা। এ চুক্তির আওতায় প্রতি ব্যারেলের মূল্য প্রিমিয়াম ৫ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার নেবে ভারত। সূত্র আরও জানায়, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত ৬০ হাজার মেট্রিক টন অপশনাল রয়েছে, সে পরিমাণ তেল সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে ভারতকে।
এদিকে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পূরণ করতে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি পার্বতীপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল আনার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, চট্টগ্রাম থেকে পার্বতীপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল পরিবহণের তুলনায় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থা সময় ও ব্যয় উভয়দিক থেকেই অধিক সাশ্রয়ী। ফলে বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
জানা যায়, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ২১৬ মেট্রিক টন, ২০২৪ সালে ২৮ হাজার ২০৪ এবং ২০২৩ সালে ৩৫ হাজার ৭১৮ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিমাসে ২০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের সূচি বজায় রেখে নিয়মিতভাবে পার্সেল গ্রহণের বিষয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এনআরএলের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ২০২০ সালে বিপিসির সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ওয়েল করপোরেশন লিমিটেডের (আইওসিএল) বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। প্রতিষ্ঠানটি ওই বছর থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করলেও ২০২২ সালে সরকার টু সরকার (জি-টু-জি) সরবরাহকারী হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই সময়ে জি-টু-জি ভিত্তিতে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহের কথা থাকলেও সম্প্রতি ভারতের কাছে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিটি ৩০ হাজার মেট্রিক টন হিসাবে ৪টি ডিজেল পার্সেল সরবরাহের কথা বলা হয়।
অবশ্য আইওসিএল সমুদ্রপথে জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে থাকে বাংলাদেশে। এ প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ১০ হাজার ৪০৫ টন সরবরাহ করেছে। ২০২৪ সালে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস ওয়েল ও অকটেন মিলে ৩ লাখ ৫১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন এবং ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৪ হাজার ১১৮ টন জ্বালানি সরবরাহ করেছে।

