Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন

যুদ্ধের প্রভাব তিন খাতে

Advertisement

মিজান চৌধুরী

মিজান চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধের প্রভাব তিন খাতে

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ডামাডোলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতর দ্রুত প্রভাব পড়েছে তিন খাতে। প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহে সীমিত ব্যাঘাত; দ্বিতীয়ত, তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য সাময়িক বৃদ্ধি এবং তরলীকৃত গ্যাসের (এলএনজি) স্পট মার্কেটে দাম বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাতের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় বিদ্যমান তেল, এলএনজি ও সারের মজুত যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে মনিটরিংয়ের পরামর্শ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। পাশাপাশি স্বল্পপরিসরে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, চলমান সংঘাত স্বল্পমেয়াদে হলে এর প্রভাব সীমিত আকারে পড়বে। বিদ্যমান মজুত ও চলমান আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে তা সাধারণত বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি করবে না।

অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতির ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি। ওই কমিটির অন্যতম সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও দেশে এর প্রভাব পড়বে না। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে কিছুটা সংকট দেখা দিতে পারে।

জানা যায়, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শুরু করেছে কমিটি। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ শুরু করেছে।

সূত্রমতে, দেশের অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে একটি বিশ্লেষণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও এ যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছে। ফলে এটি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি পরিবাহিত হয়। এই রুটে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহণ খরচ ও সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত খাদ্যশস্য ও সার সরবরাহের বৈশ্বিক বাজারকে বেশি প্রভাবিত করেছিল। কারণ, ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বে গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের প্রধান রপ্তানিকারক। রাশিয়া জ্বালানি তেল ও গ্যাসের একটি প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু এসব পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে আরোপিত হয়। এছাড়া রাশিয়ান পণ্যের প্রধান আমদানিকারক ইউরোপিয়ান দেশগুলো হওয়ায় বাংলাদেশের তেল ও গ্যাস আমদানিতে দাম বাড়লেও সরবরাহে সেসময় তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের প্রধান প্রভাব হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের ওপর, যা বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানি ও গ্যাসের প্রধান সরবরাহ লাইন হিসাবে বিবেচিত হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে বেশি থাকলে সেটা বাংলাদেশের বহিঃখাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে এবং বাণিজ্য ঘাটতি সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণ ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলছে। এই রুটে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বিমা প্রিমিয়াম ও পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এই পরিস্থিতিতে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহণে বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। ব্যবসায়ীদের মতে, স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে গত ৭ মাসে রপ্তানি কমতে কমতে প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়লে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণ সঠিক আছে। এর বাইরে আমি বলব, বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, সেটি যুদ্ধের কারণে কঠিন হবে। কারণ, সামনে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। এজন্য এখন থেকে ব্যয় সীমিত আকারে করতে হবে। তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তেলের সরবরাহ বন্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, ভিন্ন উৎস থেকে বেশি দামে কিনতে হলেও সেটি করতে হবে। তা না হলে অর্থনীতির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতির শঙ্কা থাকবে।

এর আগে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ চরম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়েছিল। ওই সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, যা বর্তমানেও ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সেই যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন করে আক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরায় বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

নির্ধারিত সময়ে ভোট না হওয়া অনির্বাচিতদের কবজায় যাচ্ছে হাজার ইউপি

অনির্বাচিতদের কবজায় যাচ্ছে হাজার ইউপি

বিশ্ব বসতি দিবস আজ আবাসনের চাপে পিষ্ট মানুষ

আবাসনের চাপে পিষ্ট মানুষ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি স্পট মার্কেট পরিহারে ৩ মাসে সাশ্রয় হাজার কোটি টাকা

স্পট মার্কেট পরিহারে ৩ মাসে সাশ্রয় হাজার কোটি টাকা

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এক বছরে ৩৪০ কোটি টাকার অনিয়ম

এক বছরে ৩৪০ কোটি টাকার অনিয়ম

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম