Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭

রাজস্ব আদায়ের কঠিন অঙ্ক

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজস্ব আদায়ের কঠিন অঙ্ক

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি। সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ সরকার ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বললেও বাস্তবে এটি ৫৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ পর্যন্ত) রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিল থেকে জুন-২০২৬ পর্যন্ত তিন মাসে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় করলেও বছর শেষে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায় কঠিন হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অতীতের ধারাবাহিকতা, অর্থনীতির বাস্তবতা এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা কঠিন এক অঙ্ক। তবে সরকার বলছে, আয় বাড়াতে প্রস্তাবিত বাজেটে তারা ছয়টি কৌশল নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-কর নেট সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, করনীতি সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কভিত্তিক রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ও অর্থবিলে এসব কৌশলের কথা উল্লেখ আছে। 

জানতে চাইলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় নয়। আবার আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও খুব যে বেশি তাও নয়। আমার বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা নিয়ে। অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা আছে কিন্তু সক্ষমতার অভাবে আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারছি না। তিনি বলেন, অতীতের ধারাবাহিকতা, অর্থনীতির বাস্তবতা এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বিবেচনায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায় কম হলে দুটি ঘটনা ঘটবে। প্রথমত, বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে আরও ঋণ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট বাস্তবায়ন হবে না। তবে শেষ কথা হলো ‘আমাদের রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই।’

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যুগান্তরকে বলেন, অস্বীকার করছি না আয়ের খাতগুলো দুর্বল। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আমরা মূলত ত্রিমুখী ব্যবস্থা নিচ্ছি। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন ব্যয় কমানো। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হলে করের হার না বাড়িয়েও আয় বাড়ানো সম্ভব। ব্যবসা বেশি থাকলে করপোরেট কর এবং মূল্য সংযোজন কর বাড়বে। পাশাপাশি বাড়বে কাস্টমস শুল্ক। এটি ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করার জন্য পৃথিবীতে স্বীকৃত একটি চমৎকার পদ্ধতি। দ্বিতীয় বড় কৌশল হলো-কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও জালিয়াতির যে ‘মরণব্যাধি’ পতিত সরকার দেশকে দিয়ে গেছে, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সরকার অত্যন্ত সচেতন। বিগত সরকারের আমলে বৈদেশিক ঋণ ৩২২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে এই ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ এক বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের সেই দায় বহন করতে হচ্ছে। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেখানে বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন নেই, যেখানে ‘ইনভেস্টমেন্ট মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাবও নেই, সেসব ক্ষেত্রে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না। পরিবেশগত প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করেই কেবল ঋণ নেওয়া হবে। তবে ধীরে ধীরে ঋণ হ্রাস করে ভারসাম্য আনা হবে। পাশাপাশি প্রশাসনের সামঞ্জস্যহীন বড় রকমের ব্যাপ্তি এবং পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে যে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল, তা আমরা আস্তে আস্তে কমিয়ে আনব। একটি বিষয় ভাবতে হবে, আমাদের অর্থনীতির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) রয়ে গেছে। এটাকে ফরমাল করে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য আমরা ডিজিটাল অর্থনীতিতে জোর দিয়েছি। দুর্নীতি কমাতে আমাদের লক্ষ্য ক্যাশলেস (নগদহীন) সোসাইটির দিকে যাওয়া। এক্ষেত্রে ইনফরমাল অর্থনীতি মূল ধারায় না এলে ক্যাশলেস করা যাবে না।’ 

প্রস্তাবিত বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আয়ের লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাকি ৩ মাসে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আয় করতে হবে। 

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অত্যন্ত কঠিন। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হবে না। আর পরিমাণ কোটি টাকা আদায় করতে হলেও বাকি তিন মাসে আরও ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। ফলে নতুন বছরের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৫৪ শতাংশ বেশি। এটি একেবারে কঠিন। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বর্তমানে দেশে কর জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় এটি অবাস্তব। এদিকে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা এবং অর্থবিলেও রাজস্ব আদায় বাড়াতে ৬টি কৌশলের কথা বলা হয়েছে। 

কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর : বাজেট বক্তৃতায় কর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের মতে, কর আদায়ে দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা হলো কর ফাঁকি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা। এসব সমস্যা দূর করতে কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বক্তৃতায় বলা হয়েছে, করদাতাদের হয়রানি কমানো এবং কর সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য কর প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে। এক্ষেত্রে অর্থবিলে অনুমোদিত ডিজিটাল সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হিসাবকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত লেনদেন, বিক্রয় ও করযোগ্য কার্যক্রম নজরদারি করা সহজ হবে।

করনীতি ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ : বাজেট বক্তৃতায় রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় সংস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসন পরিচালনার কাজকে আলাদা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর ফলে একদিকে করনীতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা বাড়বে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবায়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। সরকার মনে করছে, এই কাঠামোগত পরিবর্তন কর ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করবে।

কর নেট সম্প্রসারণ : বাজেট বক্তৃতা ও অর্থ আইন উভয় ক্ষেত্রেই কর নেট সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ আইনে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মার্চেন্ট মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। 

ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা : রাজস্ব আয় বাড়ানোর আরেকটি বড় কৌশল হলো কর ফাঁকি প্রতিরোধ। অর্থ আইনে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, নথিপত্র যাচাই, তল্লাশি এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। সরকারের ধারণা, বিদ্যমান করদাতাদের একটি অংশ সঠিক পরিমাণ কর পরিশোধ করে না। ফলে কর ফাঁকি কমাতে পারলে নতুন কর আরোপ ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে।

পরোক্ষ কর থেকে আয় বৃদ্ধি : বাজেট বক্তৃতা এবং অর্থ আইনের বিভিন্ন বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরোক্ষ করের মাধ্যমেও রাজস্ব বাড়াতে চায়। বিদেশ থেকে আমদানি করা ডিজিটাল সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আমদানিকৃত ফল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, কোমল পানীয় এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা বা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

‘থ্রি আর’ কৌশল : অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে থ্রি আর কৌশলের কথা বলেছে সরকার। এগুলো হলো-রিকভারি, রেস্ট্রোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন। অর্থাৎ ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতির পরিধি বাড়ানো হবে। এতে আয় বাড়বে বলে সরকার মনে করছে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .