দুই মহানগরে বিএনপির কমিটি নিয়ে আলোচনা
প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে ত্যাগ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি
পুরোনোদের সঙ্গে আলোচনায় আছে নতুন মুখ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা দুই মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন সামনে রেখে শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। ত্যাগী, পরীক্ষিত ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে নতুন মুখও। তবে নেতৃত্ব বাছাইয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখছে দলটির হাইকমান্ড। ফলে পুরোনো নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, নাকি নতুন মুখের ওপর আস্থা-কোন হিসাবনিকাশ গুরুত্ব পাবে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নতুন কমিটি, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল বাড়ছে।
সম্প্রতি রাড্ডা সেন্টারের ঘটনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই দিনে বিলুপ্ত করা হয় মহানগর উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও।
যদিও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি এখনো বহাল রয়েছে। এরপরও উত্তর বিএনপির সঙ্গে দক্ষিণের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য সভাপতি বা আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক বা সদস্যসচিব পদে আলোচনা হচ্ছে একাধিক নেতার নাম। এসব আলোচনায় পুরোনো কমিটির পরিচিত মুখের পাশাপাশি সামনে আসছে একঝাঁক নতুন মুখের নামও। পদ-পদবির আশায় কেউ কেউ আবার বিএনপি নীতিনির্ধারকদের কাছে লবিং-তদবির শুরু করছেন।
বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, এবার নেতৃত্ব নির্বাচনে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিতর্কমুক্ত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ কারণে পুরোনো ও আগ্রহী নতুনদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। সাবেক ও সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নেতারা যেমন নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন, তেমনি দীর্ঘদিন মাঠে থাকা নেতারাও রয়েছেন সুযোগের আশায়।
তবে বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনে এবার সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির পাশাপাশি ত্যাগী, কখনো কোনো অপরাধে সম্পৃত্ত হয়নি, দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের কাঁধে ঢাকা মহানগরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে দলের দু-একজন সিনিয়র নেতাকেও দেখা যেতে পারে দুই মহানগরের নেতৃত্বে।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি পুনর্গঠন একটি সাধারণ সাংগঠনিক নিয়ম। বিএনপিতে অনেক যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতা আছেন, যারা নেতৃত্বে আসতে চান। দল সবার অবদান বিবেচনা করেই সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেবে। তিনি বলেন, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সার্বিক বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করে এবং সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে।
অবশ্য বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট হওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্ব নির্ধারণ শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে দলের মাঠের রাজনীতি, ভবিষ্যৎ কর্মসূচি এবং রাজধানীতে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও জড়িত।
এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সম্ভাব্য নতুন কমিটির শীর্ষ পদে পুরোনো মুখ নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। সভাপতি কিংবা আহ্বায়ক পদে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হক। ফলে পুরোনো নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে। গত ৫ অক্টোবর গুলশানে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাকে সভাপতি করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ এবং ১ নম্বর সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারও আমিনুল হকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, দলের কঠিন সময়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন আমিনুল হক। নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও রয়েছে। সভাপতি পদের আলোচনায় আরও রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ-সদস্য ও সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান, মহানগর উত্তরের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, বিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনের নামও।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক বা সদস্যসচিব পদের আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির সদস্যসচিব মোস্তফা জামান। তার সঙ্গে যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিনের নামও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া সাবেক কমিশনার ও বিলুপ্ত কমিটির ১ নম্বর সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, মহানগর উত্তরের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাজি ইউসুফ ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এবং যুবদল মহানগর উত্তরের সাবেক আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েলের নামও আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে আরও অনেকে নতুন কমিটিতে জায়গা পেতে লবিং করছেন বলে জানা গেছে।
এস এম জাহাঙ্গীর যুগান্তরকে বলেন, দলের নীতিনির্ধারকরাই সাংগঠনিক দক্ষতা ও অতীতের ভূমিকা মূল্যায়ন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে যখন যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে যথাযথভাবে পালন করেছি। প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ড নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে।
এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটি বিলুপ্তির পর দক্ষিণের নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ, আ ন ম সাইফুল ইসলাম, হারুনুর রশিদ ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার নাম আলোচনায় আছে। এছাড়া কাজী আবুল বাশার, মনির হোসেন চেয়ারম্যান, নবী উল্লাহ নবীর নামও শোনা যাচ্ছে। দলীয় নেতারা বলছেন, দক্ষিণ মহানগরে নতুন করে কমিটি গঠন করা হবে কি না এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
তৃণমূলের নেতাদের একটি অংশের বক্তব্য, দীর্ঘদিন যারা সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন এবং কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। শুধু কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নয়, মাঠের গ্রহণযোগ্যতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন তারা। তাদের মতে, শুধু ক্লিন ইমেজ থাকলেই হবে না, মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে। বিশেষ করে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখা, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় করা এবং দলীয় কর্মসূচিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ারও দাবি আছে তৃণমূলে। তারা দুই মহানগরীতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন মুখও দেখতে চাইছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকা নেতাদের উপেক্ষা করা হলে সংগঠনের নিচের স্তরে হতাশা তৈরি হতে পারে। আবার পুরোনো নেতৃত্বের পাশাপাশি নতুনদেরও সুযোগ না দিলে সংগঠনে গতি আসবে না বলেও তারা মনে করেন।

