বিশ্ব কাঁপানো ফুটবল-যুদ্ধের ফাইনাল আজ
রাজা মেসি না যুবরাজ ইয়ামাল
Advertisement
ইশতিয়াক সজীব
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
লড়াইয়ের মধ্যেও লড়াই হয়। বিশ্বকাপ ফাইনালে আজ আর্জেন্টিনা-স্পেন মহারণেও দুদলের দুই বড় তারকা লিওনেল মেসি (ডানে) ও লামিনে ইয়ামালের মধ্যে জোর টক্কর হবে -এএফপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় পৃথিবীর সব রাস্তা গিয়ে শেষ হতো রোমে। আজ সব পথ গিয়ে থামবে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। যেখানে জীবনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে ফুটবলশিল্পীদের। আজ কার রাত? আর্জেন্টিনার, নাকি স্পেনের? লিওনেল মেসি, না লামিনে ইয়ামালের? এই গ্রহের আনাচে-কানাচে, দিনে-রাতে ২২ জন ফুটবলারের শেষ মহারণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে ফুটবল বুভুক্ষুদের। আজ যে বিশ্বকাপ ফাইনাল। ৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মেটলাইফে স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ বাঁশিতে যখন প্রথম ফুঁ দেবেন, বাংলাদেশে তখন রাত ১টা। নিশ্চিতভাবে ঘরে ঘরে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের অনুরাগীরা চাক্ষুস করবেন বিশ্ব কাঁপানো বিশ্বযুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত। ফুটবল আজ রাতে দুই প্রজন্মের দুই জাদুকরকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। ১৯ বছর আগে বার্সেলোনার সাজঘরে পাঁচ মাসের যে শিশুকে বাথটাবে গোসল করিয়েছিলেন সেসময় ২০ বছরের এক লাজুক তরুণ-ফুটবল-বিধাতা তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছেন শেষ মহারণে। সেই শিশুটিই স্পেনের ইয়ামাল এবং যুবক মেসি। তাদের কোনো দূর অজানা থেকে হয়তো আশীর্বাদ করবেন দুদেশের দুই কবিও-স্পেনের লোরকার জিপসি ব্যালাড ও আর্জেন্টিনার হার্নান্দেজের ফিয়েরো।
ঘটন-অঘটন, শিহরণ, রহস্য-রোমাঞ্চ পেরিয়ে ৩৯তম দিনে সূর্যাস্তে এসে পৌঁছা এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের বিরতিতে এই প্রথম থাকছে ‘হাফটাইম শো’, যেখানে পারফর্ম করবেন শাকিরা, ম্যাডোনা, জাস্টিন বিবার ও ক্রিস মার্টিনের মতো বিশ্বখ্যাত পপতারকারা। শিরোপাজয়ীদের এই প্রথম দেওয়া হবে ‘চ্যাম্পিয়ন্স রিং’। ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতির এমন অনাহূত অনুপ্রবেশে বিশুদ্ধবাদী ফুটবলরোমান্টিকরা যতই বিরক্ত হন, অবিস্মরণীয় এক শিরোপা-যুদ্ধের সাক্ষী হতে উন্মুখ সবাই। ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, তিন আয়োজক দেশ। গত ১১ জুন শুরু হওয়া ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কলেবরের বিশ্বকাপের পর্দা নামছে এবার। নিউইয়র্কের কোলঘেঁষা নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্লকবাস্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও লামিনে ইয়ামালের স্পেন। লড়াইটা হবে আসরের সেরা আক্রমণ ও রক্ষণের। আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১৯ গোল দিয়েছে। আর স্পেন সবচেয়ে কম মাত্র এক গোল হজম করেছে।
এই প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে দেখা হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের দুই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলের। র্যাংকিংয়ের দুই শীর্ষ দলেরও প্রথম ফাইনাল এটি। ফুটবল মাঠে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা মেসি ও ইয়ামালের প্রথম সাক্ষাৎও হবে আজ। অনেক প্রথমের এই স্বপ্নের ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে চতুর্থ ও স্পেনের সামনে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি। আর্জেন্টিনার অদ্বিতীয় জাদুকর মেসি এখনো অবসরের ব্যাপারে কিছু না জানালেও ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন সর্বজয়ী মহাতারকা। তবে ৩৯ বছর বয়সেও এবারের আসরে মেসি যে অবিশ্বাস্য জাদুকরী ফুটবল উপহার দিচ্ছেন, তাতে চাইলে পরের বিশ্বকাপেও খেলতে পারেন তিনি। সেটি না হলে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে মেসির বিদায় হতে পারে রাজ্য থেকে ফুটবলের রাজার সম্ভাব্য সেরা প্রস্থান। ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘লিওকে জিজ্ঞেস করুন।’ পরে যোগ করেন, ‘মেসি একজন কিংবদন্তি। ৩৯ বছর বয়সে আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা অবিশ্বাস্য। মেসি এখনো ইতিহাস লিখে চলেছে।’
রাজার রাজসিক বিদায়ের পথে কাঁটা হতে পারেন যুবরাজ ইয়ামাল। বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ার দুই সূর্য-সন্তানের প্রথম দেখা হয়েছিল ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার তৈরির অংশ হিসাবে ফটোশুটে বাথটাবে বসা পাঁচ মাস বয়সি ইয়ামালকে গোসল করিয়েছিলেন বার্সেলোনার উঠতি তারকা মেসি। বাথটাব থেকে ১৯ বছর পর আজ তারা মুখোমুখি বিশ্বকাপ ফাইনালে! বিষয়টি মেসির কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। ফাইনালের আগে শুক্রবার নিউইয়র্কের ফিফার ফ্যান ইভেন্টে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন দুদলের কোচ ও অধিনায়ক। সেখানে ইয়ামালের সঙ্গে নিজের বিখ্যাত সেই ছবি নিয়ে মেসি বলেন, ‘সে যখন শিশু, তখন তার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম। এখন বিশ্বকাপ ফাইনালে তার মুখোমুখি হওয়াটা অবিশ্বাস্য। জীবন কত অদ্ভুত! লামিনে এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমার ভালোবাসার ক্লাব বার্সেলোনায় খেলে। তাই আমি সব সময় ওর সাফল্য কামনা করি। তার সামনে এখন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন এবার সে সফল হতে না পারে।’
ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) ও ব্রাজিলের (১৯৫৮ ও ১৯৬২) পর তৃতীয় দেশ হিসাবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি আর্জেন্টিনার সামনে। এর আগে ছয় ফাইনালের তিনটিতে তারা হেরেছে। অন্যদিকে ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের এটি দ্বিতীয় ফাইনাল। দুদেশের মানুষ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বললেও দুদলের ফুটবল দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্পেনের শক্তি বলের নিয়ন্ত্রণ, দুই প্রান্তের গতি, জমাট রক্ষণ, তরুণ প্রতিভার ঝলক ও সংগঠিত দলগত ফুটবল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার বড় অস্ত্র মেসির অমলিন জাদু, অভিজ্ঞতা, চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচের আবহ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য। নকআউট পর্বের চার ম্যাচেই প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আট গোল ও চার অ্যাসিস্টে দলকে ফাইনালে তোলার পাশাপাশি গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জয়ের লড়াইয়ে এগিয়ে মেসি।
আগের ১৪ ম্যাচে দুদলেরই জয় ছয়টি করে। বাকি দুই ম্যাচ ড্র হয়েছে। ২০১৮ সালে সবশেষ সাক্ষাতে স্পেনের কাছে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবারও অনেক ফুটবলবোদ্ধা এগিয়ে রাখছেন স্পেনকে। আর্জেন্টিনা যেমন আসরে সর্বোচ্চ ১৯ গোল করেছে, স্পেন তেমনি সবচেয়ে কম মাত্র এক গোল হজম করেছে। স্পেনের রক্ষণ ভাঙার চাপ নিয়ে মেসি বলেছেন, ‘আমরা আবেগ নিয়ে ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। চাপ নিয়ে আমরা কখনোই ভাবি না। সব সময় জেতা সম্ভব না হলেও আমরা জেতার জন্যই খেলি।’
আর্জেন্টিনার শরীরনির্ভর ফুটবল নিয়ে বিতর্ক হলেও প্ররোচনার ফাঁদে পা না দিয়ে নিজেদের দর্শনে অবিচল থাকার কথা জানালেন স্পেন অধিনায়ক রদ্রি, ‘বিশ্বকাপ জেতার জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে হবে। নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলতে হবে। তবে ফাইনাল ম্যাচটি হবে আরও বেশি শরীরনির্ভর। আমাদের সেভাবেই প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা শুধু মেসিকে আটকে রাখার জন্য লড়ব না।’
জিতলে বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে মিলবে ৫০ মিলিয়ন ডলার (৬১৫ কোটি টাকার বেশি) প্রাইজমানি। রানার্সআপ দল পাবে ৩৩ মিলিয়ন ডলার (৪০০ কোটি টাকার বেশি)। ফাইনালে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
