কারখানা বন্ধ, জ্বলছে না চুলা, পাম্পে দীর্ঘ লাইন
গ্যাসের জন্য হাহাকার
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় প্রাইভেটকার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর কল্যাণপুরে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু না হওয়ায় সারা দেশে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, রেস্টুরেন্ট-সর্বত্র গ্যাসের জন্য হাহাকার। গ্যাসের অভাবে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আশপাশের এলাকার শত শত শিল্পকারখানা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারেনি। আর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার বাসাবাড়ির বাসিন্দাদের। দিনে-রাতে সামান্য গ্যাস আসেনি চুলায়। তাই রান্নাও হয়নি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউ-এর মেরামত শুক্রবারের (আজ) মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। যদি তা হয়, তাহলে এদিন সন্ধ্যা বা রাত নাগাদ টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হতে পারে। এ তথ্য এফএসআরইউ-এর অপারেটর এক্সিলারেট এনার্জি পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ভাসমান টার্মিনালটি মেরামতের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যুক্তরাজ্য থেকে বৃহস্পতিবার দুজন প্রকৌশলী এসেছেন। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে শর্ট সার্কিট থেকে এক্সিলারেটের এফএসআরইউতে আগুন লাগলে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট কমে যায়।
দেশে প্রতিদিন ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হতো। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ১১০ কোটি ঘনফুট। এখন সরবরাহ নেমে এসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে। এ কারণে সারা দেশে গ্যাসের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। এফএসআরইউ ঠিক না হওয়া পর্যন্ত সংকট চলবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু ততদিনে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদনে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এদিকে গ্যাস সংকটে সারা দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন কমেছে। তাই বৃষ্টির মধ্যেও অনেক এলাকায় লোডশেডিং চলছে।
রাজধানীর মধুবাগ এলাকার গৃহিণী উম্মে হাবিবা জানান, আগে তার বাসায় সব সময় গ্যাস থাকত। কিন্তু দুই দিন ধরে চুলায় গ্যাস থাকছে না। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে বেশ বিপাকে আছেন তিনি। কারণ, ছোট বাচ্চার খাবার দোকানে পাওয়া যায় না।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা শামসুর রহমান জানান, তার বাসায় তিনদিন ধরে গ্যাস নেই। কবে আসবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। উপায় না দেখে তিনি এলপিজির চুলা বসিয়েছেন। তার প্রশ্ন-তিতাসকে গ্যাসের বিলও দিতে হবে আবার এলপিজির সিলিন্ডারও কিনতে হবে। এভাবে একটা দেশ কী করে চলে? বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার পিনাক্যাল রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন একেবারে বন্ধ। তবে পেট্রোল পাম্প চালু আছে। সেখানে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। পিনাক্যালের এক কর্মচারী জানান, সর্বশেষ বুধবার রাতে তার রিফুয়েলিং স্টেশনে গ্যাস এসেছিল। এরপর স্টেশনে কোনো গ্যাস আসেনি। সারা দিন অলস বসে আছেন। গাড়ি এসে ফিরে যাচ্ছে।
কাওরান বাজার এলাকার বাংলাদেশ-কানাডা রিফুয়েলিং স্টেশনে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছেন থ্রি-হুইলারচালক আব্দুল হামিদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘গ্যাসের ভয়াবহ সংকট। রাজধানীর কোনো পাম্পে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কাওরান বাজারের এই স্টেশনে এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। এখানে মাঝেমধ্যে কিছু গাড়িকে গ্যাস দেওয়া হয়। আবার চাপ চলে যায়। এই স্টেশনে গাড়ির লাইন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মচারীরা।’ গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজিচালিত অনেক অটোরিকশাকে বিভিন্ন স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এ কারণে সারা দিন রাজধানীর রাস্তায় সিএনজিচালিত আটোরিকশার চালাচল কম ছিল। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।
গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শত শত শিল্পকারখানা। তিতাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপ বললে কম বলা হবে। কোথাও গ্যাস নেই। বিশেষ করে আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ অনেক কম। অনেক শিল্পকারখানা সারা দিন (বৃহস্পতিবার) বসে ছিল। এভাবে তো শিল্প চলে না। দেশ চলে না।’
ত্রুটিমুক্ত হচ্ছে টার্মিনাল : পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল-এর কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর বিদেশ থেকে ৫/৬ জন বিশেষজ্ঞ এসেছেন। বৃহস্পতিবার দুইজন প্রকৌশলী এসেছেন। টার্মিনালের প্রাথমিক ত্রুটি সারানো হয়েছে। শুক্রবার (আজ) আবারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে বিকাল নাগাদ চালু হতে পারে।
জানা যায়, ভাসমান এই টার্মিনালের সঙ্গে আমদানি করা ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন বিটিইউ এলএনজির জাহাজকে সংযুক্ত করা হবে। কোনোভাবে টার্মিনালের কিছু হলে পুরো জাহাজ বিপদে পড়তে পারে। তাই সবকিছু নিশ্চিত না হয়ে কোনোভাবে এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হবে না। চালু হলেও আংশিক হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে তবেই পুরো সরবরাহ চালু করবে এক্সিলারেট এনার্জি।
বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ : জ্বালানি নিয়ে বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এতদিন সরবরাহ করা হয়েছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ছিল ১১০ কোটি ঘনফুট। এই এলএনজি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ভাসমান টার্মিনালে কোনো সমস্যা, বিশেষ করে আগুন বা ঝড়-বাতাস হলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তখন দেশের গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসবে। এর বিকল্প কোনো কিছু দেশে নেই। ২/৩ বছরেও এর বিকল্প হিসাবে ল্যান্ড বেইজড (ভূমিতে) এলএনজি টার্মিনাল বসানোর কোনো সম্ভাবনাও নেই। ল্যান্ড বেইজড এলএনজি করতে ৭ বছর শুধু পরিকল্পনা হয়েছে। এদিকে মাতারবাড়ীতে যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে, এর পাশাপাশি আরও একটি টার্মিনাল করতে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে বর্তমান সরকার এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নিতে পারেনি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, আমদানি করা এলএনজির বাইরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসও দিনদিন কমে আসছে। এখন উৎপাদন হয় ১৬০ কোটি ঘনফুটের মতো। নতুন করে গ্যাস পাওয়া না গেলে দুই বছরে উৎপাদন ১৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। তখন দেশের অর্থনীতি আরও বিপদে পড়বে।
