Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

নীল সমুদ্রে ডুবলেন ট্রাম্প

Icon

শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ’ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির। আগে থেকে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের নীল রঙের জোয়ারের আভাস পাওয়া গেলেও এমন বিজয় অনেকেই ভাবেননি। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেট-দুটিই রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়েছে। অনেকে বলছেন, রিপাবলিকানদের ভরাডুবির কারণ ট্রাম্প নিজেই। তিনি ইসরাইলের পাল্লায় পড়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি বিপন্ন করেছেন; হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের দাম; বিশ্বজুড়ে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যেও দলটির ঐতিহাসিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনি এ ফলকে মার্কিন রাজনীতিতে ‘নীল জোয়ার’ হিসাবে অভিহিত করা হচ্ছে। ট্রাম্প ভোটে হার মেনে নিয়ে এর জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন।

নির্বাচনে দুই কক্ষে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তবে সিনেটে আব্দুল এল-সায়েদ বিজয়ী হয়ে গড়েছেন নতুন রেকর্ড। তিনি প্রথম মুসলিম হিসাবে সিনেটে সদস্য নির্বাচিত হলেন। নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসাবে পঞ্চমবারের মতো জিতেছেন রাশিদা তালিব। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ফিলিস্তিনি-মার্কিনি কংগ্রেস উইম্যান। মিশিগানের টুয়েলভথ কংগ্রেশনার ডিস্ট্রিক্টে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করেন। ৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ইলহান ওমরও।

দ্য গার্ডিয়ানের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ সিনেটে ৫৪টি দখলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা, যা আগের তুলনায় সাতটি বেশি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল ৫১টি। অপরদিকে নিম্নকক্ষের ৪৩৫ আসনের মধ্যে গণনা হয়েছে ৩৬৭টির। এরমধ্যে ২২৮টি নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। আগের তুলনায় তারা ২৫ আসন বেশি পেয়েছে। রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ১৩৯টি। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে পরিবর্তন দেখা যায়। কিন্তু নীল ঝড়ের কাছে উভয়কক্ষে রীতিমতো উড়ে গেছে লাল রিপাবলিকানরা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের শেষ দুই বছর ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও ও আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্য। এসব রাজ্যের কয়েকটি আসন দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয়ী হলেন। কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করে ৯৪ বছরের ইতিহাস ভেঙেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করে বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দিয়েছেন।

নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন। ওহাইওতে সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে আবারও সিনেটে ফিরছেন। আইওয়ায় জশ টুরেকও রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এনেছেন। এছাড়া জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ পুনর্র্নির্বাচিত হয়েছেন; নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাস সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ছিল সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ৪৩৫ সদস্যের এ কক্ষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিল ২১৮টি আসন। নির্বাচনে নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া ও কলোরাডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের আসন হারানোর ফলে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হয়।

নিউ জার্সির সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেট রিপাবলিকান টম কিন জুনিয়রকে পরাজিত করেছেন। ভার্জিনিয়ার দ্বিতীয় ডিস্ট্রিক্টে সাবেক কংগ্রেসওম্যান এলেইন লুরিয়া রিপাবলিকান জেন কিগানকে হারিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। এ ছাড়া নর্থ ক্যারোলাইনার জেমি অ্যাগার এবং কলোরাডোর ম্যানি রুটিনেলও গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছেন।

শুধু কংগ্রেস নয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম লাতিন নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস, ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এবং আইওয়াতেও দলটির প্রার্থীরা গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় জেভিয়ার বেসেরা গভর্নর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রক্ষেপণে জানানো হয়।

৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেবেন ডেমোক্র্যাটরা। সিএনএন জানায়, জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস। প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারের ক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্টের পরই স্পিকারের অবস্থান। স্পিকার হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর নতুন শক্তি পাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব কার্যত জেফ্রিসের হাতে থাকবে।

রিপাবলিকানদের হারের কারণ : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, অভিবাসননীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনি জরিপ অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক ভোটার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি তাদের পরিবারে মাঝারি বা গুরুতর আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।

এছাড়া সরকারের স্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও প্রেসিডেন্টের নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকার নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। নির্বাচনে এসব বিষয় রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী আবাসন, শ্রমিক অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়েছে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া : নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, তিনি নির্বাচনের ব্যালটে ছিলেন না; থাকলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জয়ী হতো। তিনি এ হারের জন্য ইরানকে দোষারোপ করেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নেতারা নির্বাচনের ফলাফলকে ভোটারদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া এবং প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের জন্য শক্তিশালী বিরোধী অবস্থানে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া : আল জাজিরা জানায়, ভোটে রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যানকে স্বাগত জানিয়ে ইরান বলেছে, মার্কিন জনগণ যুদ্ধকে বর্জন করেছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, এ ভোটের ফলাফলের প্রেক্ষিতে তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটনের মনোভাব বদলাবে-এমনটা ভাবা হবে বড় ভুল।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাকশিল্প বিপদে পড়বে কোটি মানুষ

বিপদে পড়বে কোটি মানুষ

প্রেষণনির্ভর এভসেক বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতায় ঘাটতি

বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতায় ঘাটতি

নীল সমুদ্রে ডুবলেন ট্রাম্প

নীল সমুদ্রে ডুবলেন ট্রাম্প

লিউ হাইশিংয়ের সাক্ষাৎ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম