Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাকশিল্প

বিপদে পড়বে কোটি মানুষ

Icon

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

তৈরি পোশাক কারখানায় একের পর এক তালা পড়লে এর মাশুল দিতে হবে পুরো দেশকে। বিপর্যস্ত হবে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। কমবে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ। চাপে পড়বে ব্যাংকঋণ, রাজস্ব আদায় ও হাজার হাজার সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কর্মহীন হয়ে পড়বেন লাখ লাখ শ্রমিক; তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো পড়বে চরম আর্থিক সংকটে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের রপ্তানি বাজারও। বাড়তে পারে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতা। অর্থাৎ পোশাকশিল্পের সংকট শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো অর্থনীতি ও সমাজে। বিপদে পড়তে পারে কোটি মানুষ।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষে এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে বিপুলসংখ্যক কারখানার উৎপাদন। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, গেল চার দিনে প্রায় ৭০০ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি পুরো দেশের জন্য উদ্বেগের, কারণ বর্তমানে এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদানও ৮ শতাংশের বেশি। ফলে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার অর্থ শুধু শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়া নয়; একই সঙ্গে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হওয়া।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি এমনিতেই ধীরগতির মধ্যে রয়েছে। তিন-চার বছর ধরে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় তৈরি পোশাকশিল্প বন্ধ হয়ে গেলে বা বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়লে বেকারত্ব আরও বাড়বে এবং অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে। তখন দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সবাইকে চিন্তা করতে হবে। এ বিষয়টিতে কোনোভাবেই রাজনীতি আনা উচিত নয়। মানুষের পেটের ক্ষুধা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে রাজনীতি করা ঠিক হবে না। অর্থনীতি আরও খারাপ হলে অপরাধপ্রবণতাও বাড়তে পারে। তখন দরিদ্র মানুষই আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, পোশাক রপ্তানি কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বড় চাপ পড়বে। কারণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। এছাড়া বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও এর ওপর নির্ভরশীল। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের চাকরি ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও গভীর হবে।

ঝুঁকিতে রপ্তানি আয় ও ডলারের প্রবাহ : বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ সম্ভব হবে না। এতে রপ্তানি বিল দেশে আসতে দেরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। ফলে শুধু চলতি সময়ের রপ্তানি আয় নয়, ভবিষ্যতের অর্ডারও ঝুঁকিতে পড়বে।

পোশাক রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান ভিত্তি। এ প্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে ডলারের সরবরাহেও চাপ তৈরি হবে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চাপে পড়বে ব্যাংক ও সহযোগী শিল্প : উৎপাদন বন্ধ থাকলে ব্যাংকিং খাতেও চাপ বাড়বে। পোশাক কারখানাগুলো চলতি মূলধন, কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকঋণ ও ঋণপত্রের (এলসি) ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ঋণের সুদ, কিস্তি ও অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু রপ্তানি বিল আটকে গেলে বা বিক্রি কমে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ সংকুচিত হবে। এতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়বে। দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারখানাগুলো আরও সংকটে পড়বে। এর প্রভাব ব্যাংকের ঋণমানেও পড়তে পারে।

পোশাকশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। সুতা, কাপড়, ডাইং, ওয়াশিং, প্রিন্টিং, বোতাম, জিপার, কার্টন ও প্যাকেজিং শিল্পের বড় অংশের ব্যবসা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি পরিবহণ, বন্দর, শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করে। কারখানায় উৎপাদন কমলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ ও আয় কমে যাবে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে। ফলে একটি শিল্পের সংকট ছড়িয়ে পড়বে পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।

এর প্রভাব পড়বে সরকারের রাজস্ব আদায়েও। পোশাক কারখানা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আয়কর, উৎসে কর ও মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আসে। উৎপাদন, বিক্রি ও রপ্তানি কার্যক্রম কমে গেলে এসব খাতের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, পোশাকশিল্পের সঙ্গে অনেক সহযোগী শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত। এ শিল্পের পশ্চাদমুখী ও অগ্রমুখী সংযোগের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ও ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ পোশাকশিল্পের সংকট শুধু এ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর বহুমুখী প্রভাব পড়বে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে।

আয় বন্ধ হলে সংকটে পড়বে শ্রমিক পরিবার : সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান নিয়ে। তৈরি পোশাকশিল্পে সরাসরি কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের নিয়মিত আয় বন্ধ বা কমে যেতে পারে। অথচ বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও ঋণের কিস্তির মতো ব্যয় অব্যাহত থাকবে। দীর্ঘদিন কাজ না থাকলে শ্রমিক পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। খাবার ও পুষ্টির ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

শ্রমিকদের আয় কমে গেলে শিল্পাঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরের মতো এলাকায় শ্রমিকদের ব্যয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান, বাজার, হোটেল, পরিবহণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। শ্রমিকদের আয় বন্ধ হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রিও কমবে। ফলে কর্মসংস্থানের সংকট শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়বে।

বাড়বে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের ঝুঁকি : দীর্ঘদিন বেকার থাকা, ঋণের চাপ, পারিবারিক সংকট ও আয়হীনতা শ্রমিক পরিবারে হতাশা বাড়াতে পারে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের আয় কমে গেলে তাদের পরিবারে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে চরম আর্থিক সংকটে কিছু মানুষের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

বিদেশি ক্রেতা হারানোর শঙ্কা : এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানো। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ বারবার ব্যাহত হলে তারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আকাশচুম্বী দাবি করলেই তো হবে না। বিদেশি ক্রেতারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে পণ্য কিনতে চাইবেন না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদেরও ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পণ্যের দাম বেশি হলে তারা বাংলাদেশ থেকে না কিনে ভিয়েতনাম, ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে চলে যেতে পারেন। গত ২০ বছরে মজুরি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠেছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

একইভাবে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে বাংলাদেশের ওপর তাদের আস্থা কমে যাবে। এতে ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশ থেকে আবার অর্ডার দেবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। একবার অর্ডার অন্য দেশে চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

যে কারণে আন্দোলন : শ্রমিকদের অসন্তোষের পেছনে রয়েছে মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। বকেয়া বেতন পরিশোধ, ছাঁটাই বন্ধ, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানি বন্ধের দাবিও রয়েছে। সরকার এরই মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন ও কারখানা বন্ধের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আর শ্রমিকরা শিল্পের প্রাণ। এই শিল্পের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যার সবটুকুই শ্রমিককেন্দ্রিক এবং শ্রমিকদের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। না বুঝে, অজ্ঞাতসারে শ্রমিকদের একটি অংশ এই ষড়যন্ত্রে পা দিয়েছে, আন্দোলন করেছে। পরে ভুল ভাঙলে শ্রমিকরা আবার কাজে যোগ দিয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাকশিল্প বিপদে পড়বে কোটি মানুষ

বিপদে পড়বে কোটি মানুষ

প্রেষণনির্ভর এভসেক বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতায় ঘাটতি

বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতায় ঘাটতি

নীল সমুদ্রে ডুবলেন ট্রাম্প

নীল সমুদ্রে ডুবলেন ট্রাম্প

লিউ হাইশিংয়ের সাক্ষাৎ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম