প্রেষণনির্ভর এভসেক
বেবিচকের নিজস্ব সক্ষমতায় ঘাটতি
সাইফ আহমাদ
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব জনবল গড়ে তোলার কথা থাকলেও বাস্তবে এখনো প্রেষণনির্ভরতা কাটেনি। প্রায় ৯ বছর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বাহিনী থেকে সাময়িক সংযুক্ত জনবল। এতে বেবিচকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এভসেকের নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরির প্রক্রিয়াও। পাশাপাশি সাময়িক সংযুক্ত কর্মকর্তাদের ঘনঘন বদলি, পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং একাধিক সংস্থার সমান্তরাল কার্যক্রমে কমান্ড কাঠামোর সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বিমানবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর অবদান ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সহযোগিতার পাশাপাশি বেবিচকের নিজস্ব এভসেক বিভাগকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক জনবলনির্ভরতার পরিবর্তে প্রয়োজন দক্ষ, স্থায়ী ও পেশাদার বেসামরিক জনবল কাঠামো। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন এবং সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রণয়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম সভা বসছে আজ। ১৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ কমিটি গঠন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় এভসেকের জনবল, ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এভসেকের দায়িত্ব পালনে বেবিচকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সাময়িকভাবে সংযুক্ত জনবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। ঘনঘন দায়িত্ব পরিবর্তনেও কাজের সমন্বয় ও জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এভসেককে একটি দক্ষ, স্থায়ী ও পেশাদার কাঠামোর অধীনে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এভসেক বিভাগের জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি একাধিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালে বেবিচকের নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের পরও নিজস্ব জনবল দিয়ে বিভাগটির পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনায় প্রেষণ ও সাময়িক সংযুক্তির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে এভসেক বিভাগে কাজ করা বেবিচকের নিজস্ব প্রশিক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে অভিজ্ঞতা অর্জন, পদোন্নতি এবং নেতৃত্ব বিকাশের স্বাভাবিক ধারাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২১ সালের নতুন অর্গানোগ্রামের আওতায় নিয়োগ পাওয়া বেবিচকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা ও পেশাগত হতাশাকে এর অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেন-একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিভাগের নিজস্ব জনবল তৈরির জন্য নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করা হলেও পাঁচ বছরেও কেন সেই কাঠামো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি? অনুমোদিত পদগুলো পূরণে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আর কোন পর্যায়ে গিয়ে নিয়োগ বা পদায়ন আটকে আছে?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এভসেকের আরেকটি বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে প্রশাসনিক সমন্বয় ও চেইন অব কমান্ড। অভিযোগ রয়েছে, ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সহায়তার জন্য আসা সদস্যদের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে বেবিচকের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত নয়। পৃথক রোস্টার ও দায়িত্ব বণ্টনের কারণে একই নিরাপত্তাব্যবস্থায় একাধিক কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া বেবিচকের সদর দপ্তর ও প্রশিক্ষণ একাডেমিতেও সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত রাখার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কতটা বিকশিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব থাকতে পারে। কিন্তু কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন, কার কাছে জবাবদিহি করবেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে দেবেন-এসব বিষয়ে একক ও সুস্পষ্ট কমান্ড কাঠামো থাকা জরুরি। অন্যথায় দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি এবং জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এবং জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সভাপতিত্বে কমিটির সভায় নিরাপত্তা কার্যক্রমে একক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণে ব্যয়, দক্ষতা থাকছে না প্রতিষ্ঠানে : এভসেকের জনবল ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় অসংগতি প্রশিক্ষণ খাতে। বিশেষায়িত এভিয়েশন নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেশি-বিদেশি পর্যায়ে বেশ ব্যয়বহুল। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নিজ নিজ বাহিনী বা মূল প্রতিষ্ঠানে ফিরে গেলে বেবিচকের বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় না।
পর্যালোচনা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এভসেকের প্রশিক্ষিত জনবলের প্রায় ৩৫ শতাংশ ছিলেন বিভিন্ন বাহিনী থেকে সাময়িক সংযুক্ত সদস্য। তাদের অনেকে বর্তমানে বেবিচকে কর্মরত নেই। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ বাবদ সরকারের অর্থ ব্যয় হলেও প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ধরে রাখার মতো স্থায়ী জনবল কাঠামো তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে বেবিচকের নিজস্ব কর্মকর্তারা উচ্চতর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে-প্রশিক্ষণের জন্য কাদের নির্বাচন করা হচ্ছে, প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কর্মপরিকল্পনা কী এবং প্রশিক্ষণে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা কতটা বাড়ছে?
আন্তর্জাতিক অডিটে কী ঝুঁকি : বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শুধু স্ক্যানার, তল্লাশি কিংবা নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ, তদারকি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং কার্যকর জবাবদিহি। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অ্যানেক্স ১৭ এবং এভিয়েশন নিরাপত্তা তদারকির আটটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মধ্যে রয়েছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ঘাটতি সংশোধনের সক্ষমতা। আইকাও-এর নির্দেশনায় এভিয়েশন নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি ও প্রশাসনিক জনবল এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা তদারকির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ রয়েছে।
বেবিচককে এভিয়েশন নিরাপত্তার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০২২ সালে আইকাও-তে দেওয়া বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন অর্গানোগ্রামের মাধ্যমে এভসেক জনবল ৭৬ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে তদারকি, প্রশিক্ষণ, সনদায়ন, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুমোদিত কাঠামোর পরও যদি নিজস্ব জনবল ও নেতৃত্ব কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে সেই সংস্কারের সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এদিকে ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে আইকাও-এর ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম-কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ অডিট চলছে। এ অডিটে দেশের জাতীয় এভিয়েশন নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে এভসেকের জনবল, প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন ও তদারকির সক্ষমতা পর্যালোচনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য বেবিচকের নিজস্ব দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা জরুরি।
কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সাময়িক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সহায়তা যেন স্থায়ী নির্ভরতায় পরিণত না হয়। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু জনবল নয়, প্রয়োজন দক্ষতা, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান।
